অণুগল্প কি সাহিত্য?

এটা ঠিক, অণুগল্পে আমার এল্যার্জি রয়েছে। অণুগল্প আমার পছন্দের নয়। ফলে অণুগল্পের বিরুদ্ধে কোনরকম যুক্তিজাল বিস্তার করাও আমার পক্ষে শোভনীয় নয়।

কারণ যে বিষয়টি ব্যক্তিগত ভাবেই আমার অপছন্দ। সেই বিষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলা অসততা। পছন্দ অপছন্দ অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আর সেইটি নিয়ে তার পক্ষে বিপক্ষে কথা বলাই অর্থহীন। এখন যিনি অণুগল্প পছন্দই করেন না। তিনি যদি অণুগল্পের মন্দ দিক নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন তবে সেই আলোচনা যুক্তিহীন ভাবেই একপেশে হতে বাধ্য। ঠিক তেমনই একজন অণুগল্প প্রেমী মানুষের পক্ষেও অণুগল্পের ভালো দিক নিয়ে আলোচনা একই রকম একপেশে হতে বাধ্য। অণুগল্প বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই আমাদের নিরপেক্ষ একটি অবস্থান থেকেই সেই আলোচনা শুরু করতে হবে। না হলে আলোচনা, ব্যক্তিগত মত প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে বাধ্য।

পরবর্তী সময়পর্বে বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে অণুগল্প কোন স্থান পাবে কি পাবে না। আজ হয়তো সেই তর্ক বৃথা। তাই আজকে কেউ অণুগল্প পছন্দ করবেন। কেউ বা অপছন্দ করবেন। অনেকেই পক্ষে বিপক্ষে বিতর্কে অংশ নেবেন। কিন্তু ঠিক এই সময়পর্বে অণুগল্প বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সঠিক বিচার বিশ্লেষণ করা কঠিন। হয়তো অসম্ভব। ফলে অধিকাংশ বিতর্কই, সেই ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ওকালতি করারই নামান্তর হয়ে উঠবে। কিন্তু তাই বলে কি সব কথা এইখানে এসেই শেষ হয়ে যাবে? নিশ্চয় নয়। তর্ক বিতর্কের বাইরেও অনেক কথা বলা চলে বইকি। আমরা যখনই কোন কিছু পছন্দ করি। কিংবা কোন কিছুকে ঘোরতর ভাবে অপছন্দ করি। তার পিছনে নিশ্চয় আমাদের মনের খেয়ালখুশি কাজ করে না। আমাদের প্রতিটি পছন্দ অপছন্দের পিছনে কোন না কোন নির্দিষ্ট কারণ থাকে। যে কারণগুলি আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রবল এবং প্রকট। সেই একই কারণ হয়তো অন্য একজনের কাছে নেহাৎই হাসির খোরাক হয়ে উঠতেও পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়ে সেই কারণগুলিই আমাদের নিজেদের কাছে অত্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েই দেখা দেয়।

অণুগল্প সম্বন্ধেও আমরা আমাদের সেই পছন্দ অপছন্দের পিছনের প্রবল ও প্রকট কারণগুলি নিয়েই পরস্পর আলোচনা করতে পারি। সেই আলোচনা অবশ্যই নিরপেক্ষ সাহিত্যিক বিশ্লেষণ হবে না। তা না হোক। তাতে ক্ষতি নাই। কেননা আমরা পূর্বেই স্বীকার করে নিয়েছি। ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়গুলি সবসময়েই একপেশে হয়ে থাকে। তাতে কোন দোষ নেই। ব্যক্তিগত ভাবে আমার অত্যন্ত প্রিয় কজন বন্ধু, যাঁরা যথেষ্ট দক্ষতার সাথে বাংলাসাহিত্যের দিগন্তে নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাঁরাও এই অণুগল্পের প্রেমে মজেছেন। সেই প্রেমে মশগুল হয়েই তাঁরাও এই ধারায় কলম চালানো শুরু করেছেন। অনেকেরই অণুগল্পের সম্ভার ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। এবং বিপুল প্রশংসিত। ফলে তাঁরা ব্যক্তিগত সম্বন্ধের প্রীতিতে আমাকেও তাঁদের সেই অণুসৃষ্টির আনন্দের ভাগ দিতে চান সময় সময়। তাঁদের সব ধরণের লেখার সাথেই আমার পরিচয় রয়েছে। কিন্তু যেহেতু অণুগল্পের বিষয়টিই আমার কাছে ঘোরতর অপছন্দের বিষয়। সেইহেতু আমার হৃদয়ের কাছাকাছি থাকা সেই মানুষগুলির অণুসৃষ্টির প্রতিও আমার বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি না হওয়াই স্বাভাবিক। এখন ব্যক্তিগত পরিচয়ের দোহাই দিয়ে আপন বন্ধুবান্ধবের অণুগল্প বলেই সেগুলি আমার কাছে মূল্যবান হয়ে উঠলে, তাঁদের সৃষ্টির প্রতিই সবচেয়ে বেশি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়।

ফলে সেসব না করে বরং আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণগুলির দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। সাহিত্যের দিগন্তে গল্পের একটা বিশেষ ভুমিকা রয়েছে্। উপন্যাস হোক নাটক হোক কিংবা কবিতা। সব কিছুর অন্তরে প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ এক বা একাধিক গল্পই আমরা খুঁজে থাকি। সেই গল্পের ভিতরে আবার এক বা একাধিক প্লট বিদ্যমান থাকে। প্লট হচ্ছে একটা ঘটনা বা ঘটনা পরম্পরা। কিংবা কোন অনুভব বা উপলব্ধি। কোন দৃশ্য বা চেতনা। যে কাঠামোর উপরে সাহিত্যিক গল্পের রূপ দিতে থাকেন। এ যেন বাঁশ খুঁটি খড়ের কাঠামোর উপরে মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়ার মতো ব্যাপার। ঐ বাঁশ খুঁটি কাঠামো না হলে যেমন মূর্তি গড়া যাবে না। ঠিক তেমনই প্লট না থাকলে গল্পও তৈরী হবে না। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন। প্লটহীন গল্প কি হয় না? সেরকম গল্প লেখার কি কোন চেষ্টা কেউ করেনি। করতেই পারেন। মানুষের অসাধ্য কিছুই নাই। নেই বলেই না অণুগল্পের আবিষ্কারও করে ফেলেছে মানুষ। তবু আমরা যদি প্লটের ভিতরেই থাকতে চাই। দেখতে পাবো এক বা একাধিক প্লটকে কেন্দ্র করেই গল্পের সৃষ্টি হতে পারে। এইখানে আমরা বলতে চাইছি। প্লটের উপরে তৈরী করা গল্প যদি সার্থক সৃষ্টি হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই গল্পটিই সাহিত্য। কিন্তু গল্পের প্লটটি সাহিত্য নয় কখনোই। আমরা গল্পকে সাহিত্য বলে মানি বলেই গল্পের প্লটকে সাহিত্য বলে মেনে নিতে পারি না।

এখন অধিকাংশ অণুগল্পেই দেখা যায়। লেখক একটি প্লটের ছবি একেঁ দিয়েছেন মাত্র। সেই প্লট থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে অবশ্যই মহৎ ছোটগল্পের সৃষ্টি হতে পারে। যা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করতে পারবে। কিন্তু তাঁর লেখা অণুগল্পটি একটি বিশেষ প্লটের সীমারেখার বাইরে সাহিত্যের দিগন্তে পা রাখতে পারে নি। এই যে না পারা, এইটিই সাহিত্যের একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমাদের অপছন্দের বিষয় হতে পারে। এবং সেই অপছন্দ থেকেই অণুগল্প সম্বন্ধেই আমাদের আগ্রহের অভাব সৃষ্টি হয়ে যায়। যেতে পারে। এখানে অনেকেই, বিশেষত যাঁরা অণুগল্পের প্রেমে মজেছেন। তাঁরা এই কথাই বলতে চাইবেন, অণুগল্পটি প্লটের বাইরে সাহিত্যের দিগন্তে পা রাখতে পেরেছে কি পারেনি। সেটি নিশ্চিত ভাবে কে ঠিক করে দেবে? খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। সত্যিই তো সেই বিচার করবার ভার কার? এইখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। আমরা আগেই কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছি। বিচারের সেই ভার আমাদের কারুরই নয়। অণুগল্প প্রেমী কিংবা অণুগল্প বিদ্বেষী। কেউই সেই বিচারের ভার নিতে পারেন না। ফলে ঠিক এইখানেই আসে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়টি। অর্থাৎ যে মুহুর্তে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমি ধরেই নিচ্ছি। অণুগল্প তার প্লটের সীমারেখার বাইরে গিয়ে পৌঁছাতে পারে না। আর পারে না বলেই তা সাহিত্য নয়। সেই মুহুর্তেই গোটা বিষয়টি ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই সেখানে আর তর্ক চলে না।

সাহিত্য মূলত জীবনের গল্প বলে। জীবনের ছবি আঁকে। কিন্তু কখনোই জীবনের সংবাদ পরিবেশন করে না। প্লট জীবনের সংবাদ থেকে জন্ম নিতেই পারে। নিয়েও থাকে। ফলে সেই প্লটের উপরেই একজন সাহিত্যিককে জীবনের রসসঞ্চার করতে হয়। একমাত্র তবেই প্লট থেকে গল্পের জন্ম হয়। সেই জন্মই সাহিত্য। এইখানে দেখা যাচ্ছে, আমরা যাঁরা অণুগল্প বিরোধী শিবিরে অবস্থান করি। তাঁদের কাছে, জীবনের রস সঞ্চারেই সাহিত্যের সৃষ্টি। একটি ঘটনার সংবাদ, একটি প্লট আমাদেরকে সেই রসের আস্বাদন দিতে পারে না। পারে না বলেই অণুগল্প আমাদের সেই জীবনরসের খিদে মেটাতে ব্যর্থ হয়। সার্থক ছোটগল্প ঠিক যে খিদে মিটিয়েই আমাদের চেতনায় সাহিত্যের দিগন্ত স্বরূপ বিস্তৃত হতে থাকে নিরন্তর। এই কারণে একটি সার্থক ছোটগল্প বারবার পড়ার পরেও পুরানো হয়ে ওঠে না। প্রত্যেকবার নতুন করে নতুন দিনের ভোরের মতো আনন্দ দিতে থাকে। সেই দেওয়ার ক্ষমতাই সাহিত্য। না, অতি দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি কোন অণুগল্পেই সেই সুযোগ নেই। একবার পড়া হয়ে গেলে, দ্বিতীয় বার পড়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ফলে যে লেখা দ্বিতীয়বার পড়ে আরাম পাওয়া যায় না। তা কখনোই সাহিত্য নয়। এই কারণেই সকালে উঠে কেউ বাসি খবরের কাগজ ছুঁয়েও দেখতে চায় না। জানা খবর কে আর জানতে চায়। প্লটের সম্বন্ধেও ঠিক একই কথা। জানা প্লট দুইবার পড়ার ধৈর্য্য থাকার কথা নয় কারুর। কিন্তু জানা গল্প বার বার পড়েও আনন্দের শেষ হয় না। এই অশেষ আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতাই সাহিত্য। সে গল্পই হোক উপন্যাস হোক। কবিতাই হোক সিনেমা থিয়েটার নাটক নৃত্যনাট্য, যাই হোক না কেন। বারংবার আনন্দ দিতে পারাই সাহিত্যের ধর্ম। সাহিত্যের কাজ। সেই কাজ তখনই সম্ভব হয়। যখন জীবনের রসসঞ্চার সার্থক হয়। একটি প্লটকে নিয়ে একজন সাহিত্যিক যখন কোন গল্প বাঁধতে থাকেন। তখন সেই সৃষ্টির পরতে পরতে তিনি জীবনের যে ছবিই আঁকুন না কেন। তাঁকে তো রসসঞ্চার করতেই হবে। একটা প্লটের সীমারেখায় সেই রসসঞ্চার সম্ভব নয়। তার জন্যেই গল্পের বিস্তারের প্রয়োজন। এই বিস্তার ছাড়া জীবনের রসকে সার্থক ভাবে প্রকাশ করা অসম্ভব। একটি প্লট সেই পরিসর দিতে পারে না। কিন্তু একটি গল্প কিংবা উপন্যাস, নাটক সেই পরিসর দিতে পারে। এখন অণুগল্প যেহেতু প্লটেরই নামান্তর। ফলে অণুগল্পেও জীবনের রসসঞ্চারের পরিসর পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে লেখকেরও সত্যিই করার কিছু থাকে না। তাঁকে শুধু প্লটের রূপরেখা টেনে দিয়েই বিদায় নিতে হয়। এ যেন অনেকটাই ভুমিষ্ট না হওয়া গর্ভের ভ্রূণের মতো। তাই অণুগল্প সৃষ্টি আসলেই সাহিত্যের দিগন্তে গর্ভপাতের সামিল। আমাদেরও অপছন্দের কারণ এইখানেই নোঙর ফেলে থাকে।

২৩শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র ভট্টাচার্য্য

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s