কবি তুমি কার?

কবি তুমি কার? কি মুশকিল। এও কি কোন প্রশ্ন হতে পারে? কবি অবশ্যই পাঠকের। কবির একমাত্র অস্তিত্ব তো পাঠকের হৃদয়েই হওয়ার কথা। হওয়ার কথা আর হয়ে ওঠার ভিতর পার্থক্য কি থাকে না?

একসময় উদভ্রান্ত যৌবনে কারুর কারুর মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি। তাঁরা তাঁদের জীবনের সন্ধিক্ষণে কিছু বিদেশী পুস্তক মুখস্থ করে বিশ্বাস করে বসেছিলেন রবি ঠাকুর মানুষের কবি নন। তিনি এলিট শ্রেণীর বুর্জোয়া কবি। স্বস্তির কথা, উদভ্রান্ত যৌবনের তাঁদের সেই ভ্রান্তি বয়োঃবৃদ্ধির সাথে, জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে কালক্রমে দূর হয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, সমগ্র রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে এক স্বকল্পিত খণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই শোরগোল তুলেছিলেন তাঁরা। শোরগোল তুলেছিলেন সেই বিদেশী তত্ব ও মতবাদের মুখস্থবিদ্যায় ভর করে। না অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিদেশী মতবাদের নিগূঢ় তত্বের সার সত্য। না ধরতে পেরেছিলেন সমগ্র রবীন্দ্রনাথের ব্যাপকতাকে। ফলে অনেকটা সেই ‘যে জন আছে মাঝখানে’র মতো অবস্থায় পড়ে গিয়ে যৌবনের উদ্দাম জীবনস্রোতে এক ভ্রান্তির আবর্তে ঘুরেপাক খেতে হয়েছিল তাঁদের বেশ কিছু কাল। সৌভাগ্যের কথা, সেই ভ্রান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাই বিশেষ ক্ষতি হয় নি তাঁদের। বিশেষ কোন কুপ্রভাবও পড়েনি সমাজে।

রবীন্দ্রনাথের কাল আর নাই। সেই সমাজও আজ আর নাই। সমাজ এখন রাজনীতির লাভ লোকাসন স্বার্থের জালে জড়িয়ে গিয়েছে। সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনীতির স্বার্থে। মানুষও আজ আর স্বাধীন অস্তিত্বের ধারক নয়। মানুষও পুতুল নাচের শিকার হয়ে জীবন যাপনে বাধ্য। আর সেই সত্যটুকু আমাদের ব্যক্তি জীবনেও এমন ব্যাপক ভাবে বাস্তব হয়ে উঠেছে যে, আমরা অধিকাংশ সময়েই নিজেদের মুখে একটি অরাজনৈতিক মুখোশ টাঙিয়ে রাখি। তাই কথায় কথায় বলতে হয়, আমি কোন রাজনীতিতে নাই। হ্যাঁ এই রাজনীতিটুকু অন্তত করতে হয় আমাদের। পাছে আমাদের আসল রং কেউ ধরে ফেলে। শঙ্কিত আমরা সদাই।

আমারা সাধারণ মানুষ। সাধারণ পাঠক। আমাদের কথা থাক। আমাদের সবসময়েই খেয়াল রাখতে হয় সমাজে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির আবর্ত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার বিষয়টুকু। আত্মরক্ষার সেই উপায়ই হলো আরাজনৈতিক মুখোশের আড়ালে নিজেকে ধরে রাখা। কিন্তু আজকের কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা? কি করবেন তাঁরা? সমাজে পাদপ্রদীপের আলোয় আলোকিত সেই মুখগুলি? তাঁরাও কি আমাদের পথই অনুসরণ করবেন? নাকি নিজ নিজ স্বার্থ ও প্রয়োজন মতো গুছিয়ে নেবেন নিজেকে?

এই বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার আগে। একটি বিষয় পরিস্কার করে নেওয়া দরকার। আমরা স্বীকার করি আর নাই করি। প্রতিটি শিক্ষিত সচেতন মানুষের একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে। থাকবেই। সেটা কোন দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় নয়। বিশেষ করে একজন সৃজনশীল সৃষ্টিশীল কবি সাহিত্যিক শিল্পীর তো বিশেষ ভাবেই থাকবে। না থাকলে তিনি অগ্রসর হবেন কোন ভুমিতে? সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ অস্পষ্ট অসচ্ছ হলেও থাকবে বইকি। এর থেকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিক্ষিত সচেতন কোন নাগরিকের মুক্তি নাই। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শ মানেই কিন্তু নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক শিবিরের খাঁচায় বন্দী হয়ে তোতাপাখি হয়ে ওঠাও নয়। এমনও হতে পারে একজন সৃজনশীল কবি সাহিত্যিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ একান্তই তাঁর নিজস্ব। তাঁর নিজেরই উদ্ভাবিত। যার সাথে সরাসরি কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা প্রচলিত কোন রাজনৈতিক তত্বের সংযোগ নাই। তাই রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা কোন অপরাধ নয়। বরং না থাকলেই সন্দেহের।

রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা একজন কবির ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। আবার সেই রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই সব ধরণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেই দূরে থাকাও একজন কবির ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। আমাদের আলোচনার বিষয় অন্য। আমাদের আলোচনা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে নয়। আমাদের আলোচনা কবি কি কোন রাজনৈতিক দলের না’কি কবি পাঠকের? আমাদের আলেচনা একজন কবি শুধুই কি কোন বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে বিশেষ কোন রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখান। নাকি অন্য কোন ব্যক্তিস্বার্থের কারণও জড়িত থাকতে পারে? আমাদের সমাজের দিকে চোখ মেললে ঠিক কি দেখতে পাই আমরা? হরেক রকমের কবির মুখ কি ভেসে ওঠে না আমাদের দৃষ্টির পর্দায়?

এককালে রাজা ও রাজত্বের যুগে রাজসভায় সভাকবি’র পদ থাকতো। জানি আমরা। এই যুগে রাজা নাই রাজত্ব গিয়েছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! সভাকবি’র একধিক পদ সৃষ্টি হয় গিয়েছে। না। সভাকবি নামটি আর নাই। সেই নামটি খসে গিয়েছে। আসল নামটি বেআব্রু হয়ে দলীয় কবি হয়ে দেখা দিয়েছে। এটি কোন গুপ্ত সত্যও নয়। আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। এই রকমই দলীয় কবিদের দেখা যায় আজকের সমাজে। যাঁরা সরাসরি কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথে ওঠাবসা করেন। করতেই পারেন। অবশ্যই সেটি তাঁদের ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। আর সেই ব্যক্তি স‌্বাধীনতার সুযোগেই তাঁরা বিশেষ বিশেষ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের তল্পিবাহক হয়ে নিজের ও চৌদ্দ‌োপুরুষের আখের গুছিয়ে নিতে স্বচেষ্ট হন। নিজের স্বার্থে নানান ধরণের সরকারী সুযোগ ও সুবিধা করায়ত্ব করেই সাহিত্য সমাজে ছড়ি ঘোরাতে চান এঁরা। এটাই দস্তুর বর্তমান সময়ে। অনেক সময়েই দেখা যায় এই সকল দলীয় কবিদের নেক নজরে পড়ে গেলেই ভাবী কবিদের কপাল খুলে যায়। আবার কপাল খারাপ থাকলে এনাদের চোখের বিষ হয়ে উঠলে সেই কবির বাজার দরও পড়ে যেতে পারে। স্টক এক্সেঞ্জের মতো। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরে থাকার এটাই সবচেয়ে বড়ো সুবিধা। স্বার্থ অনুসারে সাহিত্য বাজারে কাউকে কবি হিসাবে তুলে ধরাও যায়। আবার কারুর বাজরদর কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা যায়। ফলে এই একটা ক্ষমতার খেলা। অনেকেই প্রলুব্ধ হন। এই খেলার মস্ত বড়ো খেলোয়ার হয়ে ওঠার জন্য। স্বভাবতঃই তাঁদের কিন্তু বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের খুঁটিতে নিজেকে বেঁধে রাখলে চলে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারী ক্ষমতায় কোন দলই চিরস্থায়ী নয়। ফলে আজ যে ক্ষমতায়। কাল সে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পড়তেই পারে। পড়েও। তখনই এই সকল কবি সাহিত্যিক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের দল বদলের হিড়িক পড়ে যায়। কেউ কেউ জল মাপতে দেরী করেন। আশা করেন আগের দলই দ্রুত ক্ষমতায় ফিরে আসবে। তাই কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকেন। আর দিন যত যেতে থাকে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে ওঠেন। কারণ ক্ষমতার অক্ষের বাইরে বেশিদিন থাকা জল ছেড়ে ডাঙায় ওঠা মাছের মতোই কষ্টের। অগত্যা শেষমেশ, নতুন রাজনৈতিক শিবিরের সাথে সমীকরণ বদলাতেই হয়। কদিন আগের গালমন্দ করা রেকর্ডের বয়ানগুলি ভুলে গিয়ে গলাগলি শুরু করতেই হয় ভুতপূর্ব শত্রু শিবিরের সাথে। না তাতে যে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া কবির বিবেক দংশন হবে, তেমনটা মনে করার কোন কারণ নাই। সাংসদ বিধায়কদের বেচাকেনা দল বদলের মতো এই প্রজাতির কবিদেরও বেচাকেনা দলবদল চলতেই থাকে। শুধু আগের কাপড়ের রং বদলিয়ে যায় মাত্র। নতুন রং গাত্রে ধারণ করে আবার এনারা সমহীমায় ফিরে আসেন সাহিত্য বাজারের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে। শুরু করে দেন সেই পুরানো খেলা। সাহিত্য বাজারে ছড়ি ঘোরানো।

না বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলে এহেন কবি হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। তাই এনাদের বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে না। থাকা সম্ভবই নয়। এনারা আজ যাদের গালমন্দ করবেন। কাল তারা ক্ষমতায় এলে তাদেরই তল্পি বইবেন। এটাই দস্তুর। কেউই তাতে কিছু মনে করেন না। সকলেই ক্ষমতার নেক নজরে থাকতে চান। তাই এইসকল কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের ভক্তেরও কোন অভাব হয় না। বরং যে যত বেশি দল বদল করতে পারেন, তাঁর ভক্তের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে। ভক্তরাও বুঝতে পারেন কবির এলেমের মহিমা। ফলে একবার কবির নেক নজরে পড়তেই প্রতিদিন কবির পাদোদক নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় ভক্তবৃন্দের খাস মহলে। এটাই বর্তমান বাংলা সাহিত্যের চলমান চিত্র।

তাই শুরুর সেই প্রশ্নে ফিরে গেলে, কবি তুমি কার? এই যে একটা উত্তরে পৌঁছিয়ে যাই আমরা। এটাই একটা জাতি ও তার সাহিত্যের অধঃপতনের অভিমুখ নির্দিষ্ট করে দেয়। কিন্তু তাতে কি? কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের সাধনা এখন একটাই। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের তল্পিবাহকের কোন না কোন একটি পদ জোগার করে নেওয়া। তাহলেই কেল্লাফতে। আর “এখনো যাদের স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, শিল্প অথবা সাধনা”, -এই সকল কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

১২ই কার্তিক’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s