পরকীয়ার সাত সতেরো

পরকীয়া কি প্রেম? না মানসিক কোন রোগ? পরকীয়া কি মূলত হৃদয় জাত? না কি শরীর জাত অনুভুতি? পরকীয়া কি আসলেই বহুগামীতারই একটি রূপ? না কি পরকীয়া এটাই প্রমাণ করে, কোন প্রেম হৃদয়জাতই হোক আর শরীরজাতই হোক টেকে না বেশিদিন।

এক্সপায়ারি ডেট পেড়িয়ে গেলেই পরকীয়ার হাত ধরার দরকার পরে? না কি, প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ককে সজীব রাখতেই পরকীয়া সহায়ক? প্রতিদিনের দাম্পত্য সম্পর্কের একঘেয়েমির হাত থেকে একটা মুক্তির হাওয়া। যে হাওয়ায় একটু ফ্রেশ হয়ে এসে নতুন উদ্যোমে দাম্পত্য সম্পর্ককের সজীবতা ধরে রাখা যায়? সত্যিই কি এমনটা হয়? হতে পারে? কিংবা ধরা যাক পরকীয়া সমাজ অনুমদিত আইনসিদ্ধ একটি সম্পর্ক। সামাজিক লাজলজ্জার সাথে সম্পর্কিত নয় আদৌ। তাহলে কি পরকীয়ার মৌতাত বজায় থাকতো? না কি সব দাম্পত্য সম্পর্কই ভেঙে খান খান হতে থাকতো নিত্যদিন? আমরা অধিকাংশই মনে করে থাকি যে, সমাজ ব্যবস্থায় দাম্পত্য সম্পর্কের গণ্ডীতে পরকীয়া একটি হুমকি স্বরূপ। কিন্তু তবু নিজের জীবনে কোন পরকীয়া সংঘটিত হলে আমাদের অধিকাংশেরই ভালো লাগে। এই দ্বিচারীতা কি আমাদের মজ্জাগত সংস্কার?

পরকীয়া সম্পর্কে নারী না পুরুষ কে বেশি জড়িয়ে পড়ে? না, এমন উদ্ভট প্রশ্নও উঠে থাকে। অধিকাংশ বিবাহিত মহিলাই সভয়ে থাকেন তাঁর বিবাহিত স্বামী সম্বন্ধে। ফলে মনে হওয়াও স্বাভাবিক, পরকীয়া সম্পর্কে পুরুষরাই বেশি জড়িয়ে পড়েন বোধহয়। বেশির ভাগ গৃহবধুই সংসারেই বাঁধা গরুর মতো জাবর কাটতে বাধ্য হয় বলে আমাদরে পিতৃতন্ত্রে পতিদেবতারা আপন ঘরণীর বিষয়ে একটু বেশি নিশ্চিন্তে থাকেন না কি? বিশেষ করে ছেলেমেয়ের মা হয়ে গেলে সেই নিশ্চিন্তিটুকু বাড়ে বই কমে না। অন্তত সন্তানরা বড়ো হয়ে না ওঠা অব্দি। আর তারপর আপন স্ত্রীর যৌন আবেদনে ভাঁটার টান আসবে ধরে নিয়ে পতিদেবতাদের সন্দেহ বাতিকতায় ভুগতে হয় না ততটা। ব্যতিক্রম ব্যতিরেখে। কিন্তু সংসার সুখের হয় যে রমণীর গুণে, তাঁর পক্ষে আপন পতিদেবতাকে নিয়ে এতটা নিশ্চিত হওয়া মুশকিল। একটু দেরি করে বাড়ি ফিরলেই মনে কু গাইতে থাকে। বিশেষ করে পেশার স্থানে মহিলাদের আনাগোনা বেশি হলে তো কথাই নাই। ফলে এটা ঠিক যে পরকীয়ার বিষয়ে সভয়ে থাকেন গৃহবধুরাই বেশি। আবার সংসারে চাকুরীজীবী কিংবা পেশাজীবী স্ত্রী থাকলে পতিদেবতাদের হৃদস্পন্দও অতিরিক্ত ধুকপুক করতে থাকে। বরং একটু বেশি মাত্রাতেই করে হয়তো। বৌ রূপসী হোক না হোক। তবু আপন স্ত্রীধনকে জনতার হাটের ভিতরে ছেড়ে রাখতে অধিকাংশ পুরুষেরই হৃৎকম্প হয়ে থাকে। মুখে স্বীকার করুক আর না করুক।

পরকীয়ার সাথে লুকোচুরি আর সন্দেহ বাতিকতার একটা সমান্তরাল সম্পর্ক কিন্তু বিদ্যমান। নিজে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে আমরা লুকোচুরি খেলেত শুরু করে দিই আপন জীবনসাথীর সাথেই। আর সেই জীবনসাথী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ুক আর নাই পড়ুক। একবার কোন কারণে সেই সন্দেহ মনে উদ্রেক হলে শুরু হয়ে যায় সন্দেহ বাতিকতার রোগ। সন্দেহবাতিকতার কবলে একবার যিনি পড়েছেন, তাঁর সাথের মানুষটি হাড়ে হাড়ে টের পান, কত ধানে কত চাল। এই একটি রোগ একবার এর কবলে পড়লে আর নিস্তার নাই। চুলকানি রোগের মতোই। না চুলকালেও স্বস্তি নাই। আবার যত চুলকাবে তত বাড়তে থাকবে সেই চুলকানি। তাই সন্দেহ বাতিক মানুষদের মুক্তির সম্ভবানা শূন্য প্রায়। কোন কোন সময়ে দেখা যায় অলীক সন্দেহ বাতিকতা এমন চরমে পৌঁছায় যে, সেই অলীক সন্দেহই সত্যি ঘটে যায়। হ্যাঁ পরকীয়া লুকোচুরি ও সন্দেহবাতিকতা সবই দাম্পত্য সম্পর্কজাত।

আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজে বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভিতর পরকীয়ার প্রভাব স্বভাবতই কম। কারণ শিক্ষা ও সীমাবদ্ধ বিত্ত মানুষকে মূলত ভীত করে তোলে। সবসময়, যা আছে তা হারিয়ে ফেলার একটা অজানা আশঙ্কা মনের ভিতর ভয়ের জন্ম দিতে থাকে। সেই ভয়ের সাথে মিশে থাকে লোকলজ্জার ভয়। এই দুই ভয়ের কোনটাই থাকে না বিত্তহীন ও প্রভুত বিত্তশালীদের। তাই সমাজের একেবারে উপরের তলায় ও নীচের তলায় পরকীয়ার সংঘটন অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যায়। তবে সময়ের তালে যুগপরিবর্তনের হাত ধরে পরকীয়ায় লোকলজ্জার ভয় কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে। কারুর দিকে আঙুল তাক করলে, তাঁর পক্ষেও আরও অনেকের দিকে আঙুল তাক করার সুযোগ রয়েছে। না, এত সব চিন্তা ভাবনার ধার ধারতে হয় না সেই উপরতলার প্রভুত বিত্তশালীদের। আর নীচু তলার একেবারে বিত্তহীনদের। কে যে কার সাথে আজ আছে কাল নাই হয়ে যাবে আর আজ নাই কাল থাকবে হয়ে যাবে তার ঠিক ঠিকানা নাই।

এত গেল সামাজিকতার প্রসঙ্গ। পরকীয়ার অসুবিধার দিকগুলি। কিন্তু তাও পরকীয়া আছে থাকবে। চলছে চলবে। লুকিয়ে চুরিয়েই হোক আর ড্যাম কেয়ার করেই হোক। কিন্তু দাম্পত্যের পরিসর কতটা অবরুদ্ধ হলে পরকীয়ার জানলা খোলে। সেটা কি ভেবে দেখি আমরা? আবার এমনও ঘটে, সুস্থ দাম্পত্যের পরিসরেও তৃতীয় ব্যক্তির অনাহুত প্রবেশ পরকীয়ার খিড়কীর দুয়ার খুলে দেয়। মানুষের প্রবৃত্তির প্রভাবই এই বিষয়ের প্রধান অনুঘটক সন্দেহ নাই। প্রবৃত্তির শৃঙ্খলে আটকা পড়েই অনেকে পরকীয়ার পথে পা বাড়ায়। আবার অবরুদ্ধ দাম্পত্য পরিসরে দমবন্ধ থেকেও প্রবৃত্তির অভাবে পরকীয়া থেকে আত্মরক্ষা করেন অনেকেই। ফলে ব্যক্তি চরিত্রের গতি প্রকৃতির উপরেই নির্ভর করে পরকীয়ার দরজা খোলা না খোলা।

একথা মনে করার বিশেষ কারণ আছে বইকি, একটি সুস্থ সজীব দাম্পত্য সম্পর্কে পরকীয়া সূঁচ হয়েও ঢুকতে বাধা পায়। না লোকলজ্জার ভয়ে নয়। পারস্পরিক মিলনের রসায়নে। পারস্পরিক দাম্পত্য মিলন সার্থক হলে নারী পুরুষের দুই ভিন্নমেরু মিলে একটি অভিন্ন সত্তার জন্ম ঘটে যায়। না, অধিকাংশ দাম্পত্যেই এই অভিন্ন সত্তাটির জন্ম হয় না। অধিকাংশ দাম্পত্যেই নারী পুরুষের দুই ভিন্ন মেরু পরস্পরকে ঘিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। যত বেশি ঘুরপাক খায় ততই যেন পরস্পর পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র সত্তায় বিকশিত হয়ে উঠতে থাকে। এই যে একটি পারস্পরিক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। যে কোন দাম্পত্যেই এই স্বতন্ত্র অস্তিত্বই হয়ে উঠতে পারে পরকীয়ার সিংহদুয়ার। যতক্ষণ অব্দি এই দুই পরস্পর স্বতন্ত্র অস্তিত্বের পারস্পরিক চাওয়া পাওয়া আশা আকাঙ্খা ঠিক মত পূরণ হতে থাকে। ততক্ষণই দাম্পত্য সুখের অস্তিত্ব। তারপরেই সুখের ঘরে অসুখের আগুন লাগতে দেরি হয় না। অসুখের আগুন লাগলেই যে পরকীয়ার দমকল এসে সেই আগুন নেভাবে। তা নয়। আর যদিও সেই অসুখে পরকীয়ার জানলা দ্যুম করে খুলেও যায়। তবে তাতে গৃহদাহ হওয়ারই সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

আমাদের জানা নাই এমন কোন দাম্পত্যের কথা। যেখানে পরকীয়া অসুখী দাম্পত্য সম্পর্ককে সুস্থ করে তোলার কাজ করে। কিন্তু একটু গভীর ভাবে তলিয়ে দেখলে সেরকম সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই ঘরে রাত দিন একই মানুষের সাথে গল্প করতে কজনেরই বা ভালো লাগে বছরের পর বছর? এই কারণেই আমাদের জীবনে আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের সাহচর্য্যের গুরুত্ব এত বেশি। জানি আমরা সকলেই। কিন্তু সেই একই সূত্রে কজন আমরা খেয়াল রাখি, একই মানুষের সাথে বছর ভর শারীরীক সম্পর্ক কতটা একঘেয়েমির জন্মও দিতে পারে। যদি না পূর্বে উল্লিখিত নারী পুরুষের দুই ভিন্ন মেরু মিলে গিয়ে একটি অভিন্ন সত্তার জন্ম ঘটে যায়। যে ঘটনা প্রায় বিরলতম দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমাদের সমাজ সংসারে। রোজকার একঘেয়েমির ফলে মনের কথা বলার জন্যেও যেমন আরও অন্তত একজন কাউকে লাগে। ঠিক তেমনই শরীরের কথা বলার জন্যেও অন্তত আর একজনকে লাগতেই পারে। এটা এমনই এক স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সমাজ সংসারে বংশগতির ধারা ঠিকমত টিকিয়ে রাখতেই পরকীয়ার সেই দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বহু কাল আগে থেকেই। কিন্তু তাই বলে প্রয়োজন কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও নয়। সেই কারণেই যদি সম্পর্কের একঘেয়েমি কাটাতেই পরকীয়ার রুদ্ধ দুয়ার খুলে অবরুদ্ধ আবেগের মুক্তি ঘটে। তবে দোষ দেবো কাকে? সকলেরই কিন্তু সুখের মুখ স্বস্তির মুখ আনন্দের মুখ দেখার মৌলিক অধিকার বর্তমান। পরকীয়া যদি সেই মুখ দেখাতে পারে ক্ষতি কি? এমনটাই যদি ভাবতে শুরু করেন কেউ। লোকলজ্জার ভয়ে তাকে কদিন থামিয়ে রাখা যাবে?

৮ই অক্টোবর’ ২০২০

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s