আজকে যাদের জন্মদিন

প্রত্যেক মানুষের কাছে নিজের জন্মদিনের অবশ্যই একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আজকে যাদের জন্মদিন দিনটি আনন্দ উদযাপনের। বছরের প্রতিটি দিনই কোন না কোন মানুষের জন্মদিন। সারা বছরের বাকি দিনগুলির সাথে এর একটি জায়গায় তফাৎ। সেটি হলো, আজকের দিনটি আমার।

বিশেষ করে আমার। যদিও এই বিশেষ দিনটিই বিশ্বে আরও অনেকের জন্মদিন। আরও অনেকের মৃত্যুদিনও বটে। কিন্তু নিজের জন্মদিনটি মানুষের কাছে তার একান্ত আপন। একান্ত নিজের। এই অনুভবই তাকে এই বিশেষ দিনটিতে আনন্দে রাখে। আরও আনন্দে রাখার কারণ। এই বিশেষ দিনটিতে পরিবারের সকলের কাছে, আত্মীয় বন্ধুবান্ধব অনেকের কাছেই, মানুষের নিজের একটি বিশেষ মূল্য স্বীকৃত হয়। বছরের এই বিশেষ দিনটিতে এসে প্রত্যেকে অনুভব করে, প্রিয়জন বন্ধুজন বৃত্তে তার একটি আলাদা স্থান রয়েছে। একটি মূল্যবান স্থান রয়েছে। সকলের মাঝখানে থাকার এবং সকলের ভালোবাসার বৃত্তে থাকার এই যে একটি বিশেষ আনন্দ। আমাদের জন্মদিনেই যেন সেটি বিশেষ করে অনুভব করা যায়। এইখানেই জন্মদিনের বিশেষত্ব।

যদিও, জন্মদিন পালনের এই নাগরিক সংস্কৃতি আবহমান বাংলার সংস্কৃতি নয়। এটি ইউরোপের দান। সম্ভবত ব্রিটেন থেকে আমদানী করা সংস্কৃতি। বাংলার সংস্কৃতিতে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ কবে থেকে শুরু হয়েছে, সেটি হয়তো গবেষণার বিষয় হতে পারে। ব্রিটিশরা এদেশে আসার আগে থেকে ইসলামী যুগেই কি এই সংস্কৃতি আমদানী করা হয়েছিল? জানি না। জানি না আমরা অনেকেই। কিন্তু এটা ঠিক। ব্রটিশের শাসন আমলেই যেদিন থেকে আধুনিক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। সম্ভবত সেদিন থেকেই জন্মদিনের রেকর্ড রাখার একটা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলার টোল সংস্কৃতিতে জন্মদিনের কোন গুরুত্ব নিশ্চয়ই ছিল না। এছাড়াও, গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিতে নবজাতকের জন্মদিনের হদিশ ঠিকঠাক স্মরণে রাখার চলই কি ছিল? মনে তো হয় না। ফলে, একথা মনে করা যেতেই পারে। আমাদের বাংলার সংস্কৃতিতে ব্যক্তির জন্মদিনের আলাদা কোন গুরুত্ব ছিল না। এবং নারী সমাজের বিষয়ে যত কম বলা যায়। তত ভালো। যে সমাজে বয়সের হিসাব হতো তিন কুড়ি দু কুড়ি বয়সের মাপে, সে দেশে জন্মদিন বা জন্মদিন পালনের রেওয়াজ কেমন ছিল অনুমান করতে কষ্ট হওয়ার কথাও নয়।

জন্মদিনের গুরুত্ব যেমনই থাক। আবহমান বঙ্গসংস্কৃতিতে ঘটা করে জন্মদিন পালনের নাগরিক সংস্কৃতির ইতিহাসও খুব বেশিদিনের নয়। অন্তত, ঘরে ঘরে কেক কেটে মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে ‘হ্যাপি বার্থডে ট্যু ইউ’ মার্কা অনুষ্ঠানের আমদানী একে বারেই হাল আমলের। মোটামুটি স্বাধীনতার পরেই। যদিও পরমান্ন খাইয়ে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ। সে ব্রিটিশ আমল থেকেই চালু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই জন্মদিন পালনের আনন্দে বিকট সুরে ‘হ্যাপি বার্থডে ট্যু ইউ’ গেয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে একটা পরাধীনতার উত্তরাধিকার বহন করার অভ্যাসই ফুটে ওঠে। যেন, বিশেষ ঐ বিকট সুরের ভিতর এবং ঐ বিদেশী শব্দমালার ভিতরেই জন্মদিনের আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে। না, জন্মদিনের আনন্দ। জন্মদিন পালনের আনন্দ সেটি বিশেষ কোন ভাষা বা কোন সুরের পেটেন্ট করা থাকে না। কিন্তু বিশেষ একটি ভাষা ও সংস্কৃতির দাসত্ব করতে করতে। সেসব কথা আমরা স্মরণে রাখি না। বা কেউ বললেও কানে তুলি না। আমাদের জন্মদিন। আমার জন্মদিন। আমি যেভাবে খুশি পালন করবো। সেটি আমার মৌলিক অধিকার। অবশ্যই। এটি কোন বিতর্কের বিষয়ও নয়।

যাক, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক। না, জন্মদিনের ভিতর থেকে আমরা বাইরে আসতে চাইছি না। জন্মদিনের প্রসঙ্গেই, আরও যদি একটু ভিতরে এগিয়ে যাওয়া যায়? কোনটা আমাদের জন্মদিন? যেদিন মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীর আলো বাতাস মাটিতে ভুমিষ্ঠ হলাম। সেই দিনটি? আবিশ্ব প্রচলিত নাগরিক সংস্কৃতির রেওয়াজ মতো! কিন্তু তার আগেই তো আমরা ভ্রূণ অবস্থায় মাতৃগর্ভেই এই বিশ্বের ছন্দের সাথে বাঁধা পড়ে গিয়েছি। আমাদের জীবনের মাতৃগর্ভ পর্বটিকে সমাজ ও সভ্যতায় আমাদের জীবন বলে ধরা হয় না কেন? এমন বেয়াক্কেলে প্রশ্নই যদি করতে চায় মন? আমাদের জীবন শুরু তো আসলেই মাতৃগর্ভে। এবং জীবনের গড়ে ওঠার সেটাই প্রধানতম পর্ব। আমাদের গোটা জীবনে আমরা মূলত সেই পর্বটিকেই এগিয়ে নিয়ে চলি। এবং শারীরতত্ব অনুসারেও, মানুষের জীবনের মাতৃগর্ভজাত পর্বটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্বেই ঠিক হতে থাকে বাকি জীবনের স্বাভাবিক শারীরতত্ব কিভাবে আবর্তিত হতে থাকবে। থাক, শারীরতত্বের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। গর্ভজাত সন্তানের জন্য নারী তার জননী হয়ে ওঠার পর্বে মানসিক যে সময়ের ভিতর দিয়ে অতিবাহিত করে। আমাদের জন্মানোর সাথে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এখানে জন্মানো বলতে মাতৃগর্ভস্থিত জীবন পর্বের কথাই ধরা হচ্ছে।

কথায় বলে জননী ও তার সন্তানের ভিতরের সম্পর্ক। নাড়ীর সম্পর্ক। সেই পর্বে। যখন আমাদের শরীরের ভিত রূপ নিচ্ছে তখন আমরা আমাদের নিজ নিজ মায়ের সাথে একাত্ম হয়ে থাকি। আমাদের চেতনার অতীত সেই একান্ত একাত্মতার জীবনটা, সেই পর্বটাও তো আমারই জীবনকাহিনী নাকি? হ্যাঁ আমাদের নিজেদের জননীরও নিজস্ব জীবনকাহিনীও বটে। কিন্তু একান্ত একাত্মতার সেই পর্বেও জননীর সত্তা তার ভ্রূণের সত্তার থেকে পৃথক। একাত্ম হয়েও পৃথক। আর সেইখানেই আমাদের জীবনের ভ্রূণাবস্থার পর্ব। নিজের জীবনের গোটা পর্ব থেকে সেই পর্বকে ইচ্ছে থাকলেও, চাইলেও পৃথক করা অসম্ভব একেবারেই। তাই বলছিলাম। মাতৃগর্ভ থেকে প্রসবিত হয়ে ভুমিষ্ঠ হওয়ার দিনটিকেই জন্মদিন ধরলে। অস্বীকার করা হয় জীবন গড়ে ওঠার এই একান্ত নিবিড় পর্বটিকেই।

আবার যদি সেই পর্বটিকে স্বীকার করেই। সেই পর্বটিকে ধরেই যদি জন্মদিনের হিসাব মেলাতে যাই? সর্বনাশ! কোথায় গিয়ে পৌঁছাবো শেষে? না না। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে অতদূর যাওয়া হয়তো ততটা শোভনীয় নাও হতে পারে। কিন্তু যাদি তাও যেতেই চাই, তবে সত্যই কি পারা যাবে জানতে? ঠিক কবে আমাদের জন্ম? কবে আমাদের মাতৃগর্ভে সূচনা হয়েছিল একটি নিষিক্ত ডিম্বাণুর ভ্রূণে রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে আমাদের আজকের এই জীবন? জন্মদিনের শুভস্মৃতিতেও যে দিনটির কোন হদিশ থাকে না আমাদের কাছে। মানুষের বিজ্ঞান হয়তো আজও ততটা উন্নত নয়। হয়তো একদিন একদম ঘড়ি ধরে মাতৃগর্ভের নিষিক্ত ডিম্বাণুর ভ্রূণে রুপান্তরের সময়ও বলে দিতে পারবে বিজ্ঞান। প্রশ্ন একটাই। সেদিন কি তবে নতুন করে ঠিক হবে মানুষের জন্মদিনের তারিখ?

ততদিন আজকের মতই পালন করতে থাকবো আমরা নাড়ীছেঁড়া সেই দিনটিকেই আমাদের জন্মদিন বলে। যেদিন মাতৃগর্ভ থেকে আমাদের মুক্তির দিন। জননীর থেকে আলাদা হওয়ার দিনটিকেই আমরা জন্মদিনের উৎসব দিবস হিসাবে বহন করে চলবো। বছরের পর বছর। কিন্তু মাতৃগর্ভের সেই পর্বটি। আমাদের ভ্রূণাবস্থার সেই জীবনটি। যে জীবনের হদিশ, আমাদের ব্যক্তিজীবনের পরিসরে আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। সেই পর্বটিই কিন্তু এই আমার জীবনেরই আসল সূচনাপর্ব। প্রকৃতির ছলনায়, মানুষের গড়ে তোলা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে আজও যে পর্বটিকে আমাদের জন্মদিনের পর্বের সাথে সংযুক্ত করতে পারিনি আমরা। জন্মদিনের উৎসবের আনন্দে, একটি বারের জন্য হলেও। যদি সেই পর্বটুকুর কথা যুক্তির ভিতর দিয়ে হলেও অনুভবের চেষ্টা করতে পারি। তবেই অন্তত উপলব্ধি করতে পারবো। আমাদের নিজের জন্মদিনের ভিতরে আসলেই জননীর জীবনকাহিনীর একটি বিশেষ পর্ব জড়িত। তাই নিজের জন্মদিন আসলেই আপন জননীর মাতৃত্বের উৎসব। নিজের কাছে নিজের জন্মদিন পালনের আর বিশেষ কোন তাৎপর্য নাই। যদি না, নিজের জন্মদিনে আপন জননীর মাতৃত্বের তাৎপর্যটুকুই স্মরণে না আসে। আপন জন্মদিন তাই জননীর মাতৃত্বকে স্মরণে বরণ করার তিথি। সেই জন্মদিন মাতৃগর্ভ থেকে মুক্তির দিনই হোক। আর মাতৃগর্ভে নিষিক্ত ডিম্বাণুর ভ্রূণে রূপান্তরের দিনই হোক। প্রতিটি মানুষের কাছে তার নিজের জন্মদিনের উৎসব আসলে আপন জননীর মাতৃত্বকে স্মরণ করার উৎসব।

২৫শে শ্রাবণ’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s