বিদ্যাসাগরের বীর্য

বিদ্যাসাগরের বীর্য। তিনি কবে কোন কালে কোথায় কোথায় কোন নারীকে বিলিয়ে গিয়েছিলেন আর সেই বীর্যসংবাদ কার কার পূর্বপূরুষের কানে কানে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাই নিয়ে বঙ্গ সমাজে বেশ একটা হইচই পড়ে গিয়েছে।

বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে এমন উচ্চাঙ্গের গবেষণা শুরু হয়ে গিয়েছে, যে বর্ণপরিচয়ের নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশিত হওয়াও বিচিত্র নয়। বাংলা ভাষায় বর্ণচোরা বলে চমকপ্রদ একটি শব্দ রয়েছে। অনেকের কৌতুকপ্রবণ মননে সেই শব্দটি নিয়েও বোধ করি টানাটানি পড়ে গিয়েছে। সে যাই হোক। তবুতো হঠাৎ করে বিস্মৃতপ্রায় মানুষটি নিয়ে আবার একটু হট্টোগোল শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগেই অবশ্য তাঁর জন্মের দ্বিশতবার্ষিকীর সময় তাঁর মর্মর মূর্তী ভাঙ্গা নিয়েও একটা রাজনৈতিক কাজিয়ার হট্টোগোল উঠেছিল। কিন্তু সমসাময়িক ভোটপর্ব মিটে যেতেই তা স্তিমিত হয়ে যায়। আমাদের বাংলায় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভোটের হিসাব ওলোট পালোটেও বিদ্যাসাগেরর মূর্তীর মূল্য অমূল্য। নির্বাচনী ফলাফলে তার লক্ষ্মণ ধরা পড়েছিল তখনই। না রাজনীতি নিয়ে কথা বলে লাভ নাই। সেটি সাংসদ বিধায়কদের বিষয়। মন্ত্রী নেতা নেত্রীদের বিষয়। তাতে বিদ্যাসাগর মাইল আবিষ্কার করুন আর সহজপাঠ লিখুন, বাঙালির তাতে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে অসুবিধা হয় না। হয় নি। তাই সে কথা থাক। আমাদের আলোচনার বিষয় বিদ্যাসাগরের বীর্য।

সত্যিই আমরা এই বিষয়ে কত অজ্ঞান ছিলাম এতদিন। ভাবলেই নিজেকে কেমন গণ্ডমূর্খ বলে মনে হচ্ছে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। এতবড়ো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না। জানতে পারি নি। আচ্ছা বিদ্যাসগরের জীবনীতেও কি এই তথ্য ছিল না। সামাজিক মাধ্যমের আলোড়ন দেখে তো তেমনই মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, কে আর দুশো বছরের পুরোনো একটা লোকের জীবনী পড়তে যাবে। ফিল্মস্টার কি খেলোয়ার হলে না হয় কথা ছিল। অবশ্য দুশো বছর আগে সিনেমা শিল্প ছিল না। সে কথা থাক। কিন্তু যাঁরা বিদ্যাসাগরের জল ছেঁচে ডক্টরেট করে নামের আগে ডঃ লিখতে গর্ববোধ করেন। তাঁরা নিশ্চয় এই ভদ্রলোকের জীবনী পড়েটড়ে থাকবেন। অন্তত সেই আশা করাই সঙ্গত। তাঁরাও কি কিছুই জানতেন না। এই বিষয়ে? জানলে অন্তত ভার্চ্যুয়াল সামাজিক পরিসরে সেই সংবাদ জানাতেন আশা করি। ফলে মনে হচ্ছে। সত্যিই এ এক ঐতিহাসিক আবিষ্কারই বটে। অন্তত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর এতবড়ো ঐতিহাসিক আবিষ্কার বঙ্গসমাজে এর আগে আর ঘটে নি। বিদ্যাসগরের বীর্য বলে কথা!

এখন সত্যিই আমাদের সযত্নে অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। ভালো করে খুঁজে দেখা দরকার আর কোন কোন বংশ বিদ্যাসাগরের ঔরসজাত। না। প্রিয় পাঠকবর্গ। বিষয়টি ঠিক হেসে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে কি? না মনে হয়। কারণ এইসকল বংশের আজকের উত্তরাধিকারী যারা, তারা তো জাতির গর্ব। এবং এই সকল ঐতিহাসিক বংশগুলিকে সরকারী স্তর থেকেই হেরিটেজ বংশ বলে ঘোষণা করা দরকার। কি বলেন সকলে? অন্তত সমাজের ভিতর থেকে এমন একটা প্রস্তাব ওঠাই কি সঙ্গত নয়? এবং যিনি বা যাঁরা এই ঐতিহাসিক গবেষণা করে আমাদের চোখ খুলে দিলেন। কান খুলে দিলেন। এমনকি নাকও খুলে দিলেন। তিনি বা তাঁরা সত্যি করেই কি আমাদের চিরঋণী করে রাখলেন না? তাঁদের কাছেও তো আমাদের কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, অনেকেই দেখি এই বিষয়ে বরং উল্টো পথের পথিক। চারিদিকে গালমন্দের হিড়িক পড়ে গিয়েছে যেন। বিদ্যাসাগরের নতুন নতুন বংশ অবিষ্কারের পথ খুলে দেওয়াই যেন তাঁদের অপরাধ হয়ে গিয়েছে। না না, আমরা অন্তত এতটা নির্দয় হতে পারি না। আমাদেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে বইকি। এটি গণতন্ত্রের পিতৃভুমি না হোক। আমদানিকৃত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতন্ত্রতো বটেই। ফলে সকলের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে পারি না নিশ্চয় আমরা। মত প্রকাশের অধিকার আমাদের সকলেরই রয়েছে। তাই বলছিলাম আমরা যদি সেই বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে যাই! তবে ভবিষ্যতে কেউ কি আর এমন চমকপ্রদ ঐতিহাসিক গবেষণার পথে অগ্রসর হবেন কোনদিন?

হ্যাঁ সকলেই যে বিষয়টি বুঝতে পারছেন না, তেমনটিও নয়। অনেকেই এমন অসাধারণ গবেষকের দেওয়া তথ্য নিয়ে উল্লাসে মেতেছেন। আজকের বাঙালি বুদ্ধিজীবী ইনটেলেকচ্যুয়ালরাই শুধু যত্রতত্র বীর্য বিলিয়ে চলেন না। স্বয়ং বিদ্যাসাগরও তাই করতেন। ফলে বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজের সেই সব মাথারা, যাঁদের এইরকম বীর্য বিলানোর বিষয়ে সুনাম রয়েছে, তাঁরা যে সত্যই বিদ্যাসাগরকে মাথায় করে রেখেছেন। সেটাই তো আজ প্রমাণিত হয়ে গোল দিনের আলোর মতোন নাকি? পাঠকবর্গ, একটু মাথা শীতল করে ভেবে দেখতে পারেন। সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীদের ভিতর, এই রকম যত্রতত্র বীর্য বিলানোর ভিতরে কতবড়ো দেশপ্রেম নিহিত রয়েছে। তাঁরা সকলেই জানেন। তাঁরা সমাজের বাকি সকলের থেকে অনেক বেশি উচ্চস্থানে অবস্থান করেন। আপন প্রতিভাবলে। সাধারণ জনগণের তো আর প্রতিভা থাকে না। প্রতিভা থাকে হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কয়েকজনেরই শুধু। সেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিভাধর বাঙালি যদি দয়াপরবশ হয়ে, বিদ্যাসাগরের মতোন বীর্য বিলিয়ে সমাজের ভিতরে দোফসলী তিনফসলী কিংবা বহুফসলী প্রতিভার চাষাবাদ শুরু করেন। তবে ক্ষতি কি? বরং তাঁদের প্রতিভার বীর্য যত বেশি নারীর গর্ভে নবজাতক প্রতিভা হয়ে জন্ম নিতে থাকবে, তাতে তো সমগ্র বাঙালি জাতিই উপকৃত হবে। হচ্ছেও নিশ্চয়। আমরা বুঝতে পারছি না ঠিক মতো। কারণ আমাদের চোখ বন্ধ। কান বন্ধ। নাক বন্ধ। আগামী সময়ের এমনই চমকপ্রদ গবেষকদের ঐতিহাসিক গবেষণায় নিশ্চয় জানা যাবে এই সময়ের কোন কোন প্রতিভার বীর্য কোথায় কোথায় বহুফসলী চাষাবাদ করে যাচ্ছে। সে তথ্য আজকের মানুষের জানার কথা নয়। জানার কথা শখানেক বছর পরের বাঙালির। শুধু ট্র্যাডিশানটুকু ধরে রাখতে হবে সযত্নে।

না বিদ্যাসাগরের বীর্য বিতর্কের কোন পক্ষেই আমরা কোন অবস্থান নিচ্ছি না। তবে তার মানে এটাও নয়, যে পরিবারের নির্দেশেই বিতর্কসভার মাঝখানে বসতে হচ্ছে। বিষয়টি তেমনও নয়। আমরা সত্যই বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করার বদলে সদর্থক ভাবেই আলোচনা করতে প্রয়াসী। সত্যিই তো একটি জাতির উন্নতিতে উন্নত প্রতিভার বীর্যের কত মূল্য। একথা কে না স্বীকার করবে। এই তো দেখুন না, এখন প্রযুক্তিও কত উন্নত হয়ে উঠেছে। এই যুগে বীর্যদান অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। আমাদের বাঙলার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মাথারা, যদি সরকারী প্রকল্পের মাধ্যমে সেই কাজে এগিয়ে আসতে পারতেন। তবে কতই না ভালো হতো ভাবুন। এখনকার মতো নিজের স্ত্রী বা প্রেমিকাকে লুকিয়ে যত্রতত্র বীর্য বিলিয়ে বেড়াতে হতো না। সরকারী প্রকল্পের আওতায়, উৎসাহী আগ্রহী নারীরা স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়ে রাখতে পারতেন। পছন্দের বুদ্ধিজীবীর বীর্য গ্রহণের জন্য। বুদ্ধিজীবীরাও বীর্যদান খাটে উঠে কত বড় একটা সামাজিক কাজে অংশ নিতে পারতেন ভাবুন। তাতে তো বাংলার সমাজ ও বাঙালি জাতিই উপকৃত হতো নাকি?

তা না, অনেকেই এই নিয়ে ছি ছি উৎসবে মেতেছেন। দেখে দুঃখে বুক ফেটে যায়। তাদের দাবি, এইসব ঐতিহাসিক তথ্যটথ্য সবই নাকি ভুয়ো। শুধুমাত্র বীর্যদানকারী বুদ্ধিজীবী বীরদের লুকিয়ে চুরিয়ে বীর্যদানের সামাজিক লজ্জা থেকে আড়াল করতেই নাকি এই অপকর্ম। বিদ্যাসাগরের বীর্য নিয়েই টানাটানি। তা টানাটানি হোক। ভদ্রলোকের কোন কিছু নিয়েই যখন দুইশো বছরে টানাটানি হয় নি। মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থে মানুষটির মর্মর মূর্তী নিয়ে টানাটানি ছাড়া। বিদ্যাসাগরের এই বীর্য নিয়েই টানাটানি করতে করতে তবুও যদি বাঙালির আগ্রহের অভিমুখ দুশো বছর পরে হলেও কিঞ্চিত বিদ্যাসাগর মুখী হয়। তাতে ক্ষতি কার? কেউ যদি এই বীর্যকাহিনীর সত্যতা নিয়েই আগ্রহী হয়ে, জীবনে প্রথম মানুষটির জীবনী নিয়ে পড়তে বসে? বীর্যের হদিশ পাক বা নাই পাক। হঠাৎ যদি আসল মানুষটিরই হদিশ পেয়ে যায়। দুচার জন! দুশো বছরেও যার হদিশ পাই নি আমরা আজও। বা আরও স্পষ্ট করে বললে, বলা উচিৎ, হদিশ পাওয়ার কোন চেষ্টাই করি নি। সারা জীবনে। ফ্রক বা হাফপ্যান্ট পড়া বয়সে একপাতা রচনা মুখস্থ করা ছাড়া। আর তো কোন আগ্রহ ছিল না আমাদের কারুরই। একমাত্র কারণে অকারণে মানুষটির মূর্তী ভাঙা ছাড়া। তাই আসুন না। আজ না হয় বিদ্যাসাগের বীর্যের সন্ধানেই পা বাড়াই সকলে। দুচার জন ভাগ্যবান যদি বা তাঁর নাগাল পেয়েই যান। তবে তো লাভ জাতি হিসাবে বাঙালিরই। বিস্মৃতপ্রবণ জাতি হিসাবে বিশ্বে যাঁদের শ্রেষ্ঠস্থান আজও টলে যায় নি। আজ যদি বিদ্যাসাগরের তথাকথিত বীর্য একটুও হলে সেই স্থান টলিয়ে দিতে পারে। আখেরে লাভ হবে পরবর্তী বিদ্যাসাগরদেরই। তাই আর দেরি নয়। চলুন এগো‌নো যাক।

২০শে শ্রাবণ’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s