বাঙালির অনুবাদচর্চা

সাহিত্যচর্চার অন্যতম এক অভিমুখ হলো অনুবাদচর্চা। একটি ভাষার সাহিত্য ঠিক ততটাই উন্নত, যতটা উন্নত তার অনুবাদচর্চার দিগন্ত। বিগত কয়েকশো বছরের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে। ইউরোপের সাহিত্যই আবিশ্ব সাহিত্যচর্চায় নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। যদিও বর্তমানে লাতিন আমেরিকান সাহিত্য সেই নেতৃত্বের ভার বহন করছে।

এখন ইউরোপের সাহিত্যের এই নেতৃত্ব দেওয়ার পর্বের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাবো। সেখানে প্রায় প্রতিটি ভাষার সাহিত্যই প্রায় প্রতিটি ভাষায় অনুদিত হতো। এবং ইউরোপের সাহিত্যানুরাগীরা নিজ ভাষার সাহিত্য যেমন নিজের ভাষাতেই পড়তেন। ঠিক তেমনই অন্যান্য দেশের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যও অনুবাদের মাধ্যমে সেই একই নিজের ভাষায় পাঠ করতেন। ফলে নিজের দেশের সাহিত্য ও বিদেশের সাহিত্য সবই তারা পড়তেন নিজ নিজ মাতৃভাষায়। পাঠককে আমি এই তথ্যটুকুর দিকে বিশেষ নজর দিতে অনুরোধ করবো। এর ফলে সাধারণ সাহিত্যপ্রেমীদের সাথে অতি সহজেই দেশ বিদেশের সাহিত্যের একটা তুলনামূলক পরিচয় ঘটে যেত। এর ফলে নিজ মাতৃভাষার সাহিত্যের সঠিক অবস্থানটুকু সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কোন ধোঁয়াশার সৃষ্টি হতো না। যাকে বলে ওভার এস্টিমেট কিংবা আণ্ডার এস্টিমেট করার সুযোগ থাকতো না। এবং শুধুই ইউরোপের সাহিত্যই নয় বিশ্ব সাহিত্যের সাথেও তাদের সরাসরি সংযোগ ঘটতো আপন মাতৃভাষাতেই। হ্যাঁ মাতৃভাষায় অনুবাদের ভিতর দিয়ে। এর ফলে দেশ ও জাতির একটা বৃহত্তর অংশের মানুষের, যারা সাধারণ ভাবে লেখাপড়া জানেন। তারাও বিশ্বসাহিত্য ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাহিত্য সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা রাখতে পারতেন। শুধু মাত্র সমাজের অভিজাত শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের মুখ নিঃসৃত বাণীর উপরেই ভরসা করতে হতো না। সারা দেশের লেখাপড়া জানার জনমানসে এর একটা সুদৃঢ় ও পরিব্যাপ্ত প্রভাব পড়তো। তাতে সুবিধেটি এই হতো যে, শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণীর ভিতর থেকেই নতুন নতুন যুগান্তকারী লেখক লেখিকারা আসতেন না। মোটামুটি ভাবে সমাজের প্রায় সর্বস্তর থেকেই প্রতিভাবান লেখক লেখিকারা উঠে আসতে পারতেন। একটি দেশ ও জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে এর থেকে বড়ো আশীর্বাদ আর হয় না। ঠিক এই পথেই রাশিয়ান, স্প্যানীশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইতালীয়ান, ইংলিশ, গ্রীক, স্লাভাক, ডাচ, সুইডিশ, ফিনিশ, পোলিশ, হাঙ্গেরিয়ান, রোমানিয়ান প্রভৃতি প্রতিটি ভাষার সাহিত্য গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল। এবং এর ফলে আরও একটা সুফল ফলেছিল। এই এত বিভিন্ন দেশের এতগুলি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য সংস্কৃতির ভিতর একটা নিরন্তর আদান প্রদান দেওয়া নেওয়ার পর্ব চলতে পারতো‌। যে আদান প্রদান পুষ্ট করতো পারস্পরিক সাহিত্য সংস্কৃতিকে। সমৃদ্ধ হয়ে উঠতো প্রতিটি ভাষার সাহিত্যই।

যে কোন ভাষার সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য এইটাই একমাত্র পথ। কোন ভাষার সাহিত্যই অন্যা‌ন্য ভাষার সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে সমৃদ্ধ হতে পারে না। এত কথা বলার আসল কারণ অন্য। আসল কারণ হলো আমাদের আ-মরি বাংলাভাষার সাহিত্যের দিগন্তে অনুবাদের বিশেষ কোন ভুমিকা আজও গড়ে ওঠেনি। ফলে সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, বাংলা সাহিত্য অনেক বেশি পরিমাণে আপন অক্ষের চারপাশেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। জানি অধিকাংশ পাঠকই সমস্বরে এই কথার তীব্র প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠতেই পারেন। কিন্তু তবু তো কখনো সখনো আমাদেরকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবেই। অন্তত হওয়াই উচিৎ। সেটি যত শীঘ্র হয়। ততই মঙ্গল। কিন্তু আমরা স্বীকার করি আর নাই করি। সত্যই বাংলায় অনুবাদ সাহিত্য আজও নিজের পায়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে নি। ফলে, সেই ফাঁকটা আমাদেরকে ঐতিহাসিক ভাবেই পূরণ করতে হয় সেই ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী ভাষাটি, ইংরেজির দাসত্ব করেই। যে কোন বিষয়ে ইংরেজি ভাষার অনুবাদই আমাদের অনুবাদের অভাব পূরণ করে থাকে। এমনকি ভারতের অন্যান্য ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্যের অনুবাদের জন্যও আমাদের ইংরেজির দারস্থ হতে হয়। না তাতে শিক্ষিত ও অপশিক্ষিত বাঙালির কোন অসুবিধাও হয় না। আমরা জানি, আমাদের যখনই ইংরেজি বাদে অন্যান্য কোন ভাষার সাহিত্য পাঠের প্রয়োজন পড়বে, যদি পড়ে, তবে ইংরেজি অনুবাদের ভিতর দিয়েই আমাদের সেই প্রয়োজন মিটে যাবে সহজেই। একটি জাতির পক্ষে কি বীভৎস এক পরিস্থিতি। না, দুঃখের সাথে হলেও। একথা বলতেই হবে যে সেই বীভৎসতার বিষয়ে শিক্ষিত অপশিক্ষিত কোন বাঙালিই বিশেষ সচেতন নয়। কেউ থাকলে, তিনি নিতান্তই দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ। ব্যতিক্রম মাত্র।

না, ইউরোপবাসী কেউ, সে তিনি জার্মান ইতলীয়, ফরাসী, রুশ, স্প্যানীশ। ব্রিটিশ, যেকেউই হোন না কেন, নন ইউরোপীয় কোন বিশেষ ভাষার উপরে এমন পরনির্ভরশীল হয়ে অনুবাদের স্বাদ মেটাতে পারতেন না কখনোই। অনুবাদের কাজই হলো, অন্য ভাষার সামগ্রী আমার মাতৃভাষায় হাতে গরম উপহার দেওয়া। সেটি কোন বিদেশী ভাষায় সম্ভবই নয়। প্রতিটি ইউরোপীয় শিক্ষিত মানুষ এই সহজ সত্যটুকু জানেন। সে সত্য সেখানে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে না কখনো। কিন্তু আমাদের হয়। হয় কারণ। আমাদের নির্ভরশীলতা নির্দিষ্ট একটি বিদেশী ভাষার উপরেই। এবং আপন মাতৃভাষার সম্বন্ধে একটি সার্বিক উদাসীন তাচ্ছিল্য। এর ফলে বিশেষ কয়েকটি অসুখের জন্ম হয়। হয়েছে আমাদের বাঙালিদের বিশেষ করে। আমাদের না শেখা হয় আপন মাতৃভাষা। না পাণ্ডিত্য অর্জন হয় সেই পরনির্ভরতার ইংরেজিতেই। না ঘরকা না ঘাটকার মতোই আমদের অবস্থা হয় সুকুমার রায়ের সেই ট্যাঁশগরুর মতোই।

ধরা যাক। মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট। কিংবা লরেন্সের উইমেন ইন লাভ বা রেনবো’র মতো বিখ্যাত উপন্যাস। কলকাতার অনেক বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু ইংরেজি তো আর কাঁটাতারে ছিন্নভিন্ন এই বাংলার মাতৃভাষা নয়। যে শতকরা একশো জন লেখাপড়া জানা মানুষই ইংরেজিতে পণ্ডিত। তাদের জন্যে তো এই বইগুলির বাংলায় অনুবাদ পাওয়ার দরকার ছিল। আমি বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার এই কয়টি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম করলাম তার বিশেষ কারণ রয়েছে। অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জুতে দেওয়া হয়েছে বাংলার কচিকাঁচাদের। দেশের সব কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার প্রধান মাধ্যম সেই ইংরেজি। অতি শিক্ষিত উচ্চ শিক্ষিত ইংরেজি ভাষায় সুপণ্ডিত মহাপণ্ডিত বাঙালির সংখ্যাও তো খুব কম নয়। অন্তত গত তিনশ বছরের মোট হিসাব ধরলে। তাহলে, এতো যে ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য। তা সেই ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যসম্পদগুলিই বা কেন বাংলা অনুবাদে সহজলোভ্য নয়? কেন একজন বাঙালিকে সেই গ্রন্থগুলি পাঠ করতে গেলে ইংরেজিই শিখতে হবে? এর একটা সহজ কিন্তু মস্ত বড়ে ফাঁকিবাজি উত্তর আমাদের ঠোঁটের আগাতেই থাকে। না বাংলায় অনুবাদসাহিত্যের কোন বাজার নাই। নিত্য প্রয়োজনীয় অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজার ছাড়া, আর সকল সামগ্রীর বাজারই তৈরী করে নিতে হয়। এটাই আর্থসামাজিক ধরণ। ফলে বাজার তৈরী করলেই বাজার থাকে। কিন্তু না তৈরী করলে থাকবে কি করে? ফলে সেটি কোন কারণ নয়। আসল কারণ বরং তিনটি।

প্রথমত যে যত বড়ো পণ্ডিতই হোন না কেন ইংরেজি থেকে বাংলায়, অনুবাদ করার দীক্ষা ও শিক্ষা এবং সক্ষমতা তাঁদের নাই। তৈরীই হয় নি। না হওয়ার বড় কারণ হলো বাঙালির কাছে ইংরেজি একটি অর্থকরি ভাষা। সেই ভাষা শিখে কাম্য অর্থের ঝনঝনানি বাজতে শুরু করলেই আমাদের শখ আহ্লাদ অধ্যাবসয় সব শেষ। ফলে ইংরেজিতে যত বড়ো পণ্ডিতই হোন না কেন। ইংরেজি সাহিত্য থেকে অনুবাদ করতে গেলে ইংরেজি ভাষার যতটা গভীরে গিয়ে পৌঁছাতে হয়, এঁদের সেই গভীরে যাওয়ার সামর্থ্য নাই। সামর্থ্য নাই, সেই ইংরেজির সঠিক বাংলায় অনুবাদেরও। মাতৃভাষায় গভীর দক্ষতা না থাকলে কখনোই অনুবাদ করা সম্ভব নয়। আর বাঙালির মাতৃভাষায় দক্ষতার বহর মাপতে গেলে গোটা জাতিটাই হাসির খোরাক হয়ে উঠবে। এই প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয়ের উপরে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। বাঙালির যাবতীয় প্রবন্ধের পাতায় পাতায় বিদেশী কোন লেখকের উদ্ধৃতি থাকলে, সে তিনি ফরাসী হোন আর জার্মান কি রুশই হোন। কিংবা চৈনিক কি জাপানী। সেই উদ্ধৃতি থাকে ইংরেজি ভাষাতেই। যাঁর উদ্ধৃতি, অধিকাংশ সময় দেখা যাবে, তিনি জীবনে একটি বাক্যও ইংরিজিতে বলেন নি। বা বলতে সক্ষম ছিলেন না। কিন্তু বাঙালি পণ্ডিতের বাংলা প্রবন্ধে একজন রুশ লেখকের উদ্ধৃতি দিব্বি ইংরেজি কোটেশানে ছাপা হয়ে যায়। এই সীমাহীন মূর্খতা একমাত্র শিক্ষিত বাঙালি ছাড়া মনে হয় না কোন জাতি লালন করে পালন করে। অথচ, সেই একই বাঙালি গবেষক কি প্রাবন্ধিক যে ইংরেজি বই থেকে সেই রুশ কি ফরাসী লেখকের উদ্ধৃতিটি সংগ্রহ করেছেন, সেখানে কিন্তু তিনি দেখেছেন, ইংরেজি ভাষার লেখক, তাঁর লেখায় উদ্ধৃতিটুকুও মাতৃভাষায় অনুবাদ করে তবেই ছাপিয়েছেন। নিজের জাতির কাছে, নিজের ভাষার কাছে, নিজের শিক্ষার কাছে প্রকৃত শিক্ষিত একজন মানুষের এখানেই মূল দায়দ্ধতা। আমাদের শিক্ষিত বাঙালি ইংরেজি ভাষার পণ্ডিতরা সেসব দেখেও শেখে না। সেই মেরুদণ্ডই তাদের নাই। ফলে সামান্য উদ্ধৃতিটুকুই যারা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার ক্ষমতা রাখেন না, সেই সব ইংরেজি জানা বাঙালি পণ্ডিতদের কাছে ইংরেজি সাহিত্যের বাংলায় অনুবাদ করার কথা আশা করাই অন্যায়।

দ্বিতীয়ত, স্বল্প শিক্ষিত অল্প শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত শিক্ষিত উচ্চ শিক্ষিত এবং অতি শিক্ষিত বাঙালির আবার বাংলায় অর্থাৎ কিনা মাতৃভাষায় ইংরেজি সাহিত্য পড়তে লজ্জায় মাথা কাটা যায়। স্মরণে রাখা দরকার কোন ফরাসীরই কিন্তু মাতৃভাষায় ইংরেজি সাহিত্য পড়তে লজ্জায় মাথা কাটা যায় না।

তৃতীয়ত, আজীবন আগাগোড়া নির্দিষ্ট একটি বিদেশী ভাষার দাসত্ব করতে করতে, কোন মানুষেরই আর স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তির কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সে নতুন কোন মৌলিক চিন্তা করতেও সক্ষম নয়। সক্ষম নয় কোন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতেও। যে উদ্যোগ তার আপন স্বজাতির উন্নতি সাধনে আশু প্রয়োজন। তাই ইংরেজি ভাষার যত বড়ো পণ্ডিতই হোক না কেন, ইংরেজি সাহিত্যের মনিমাণিক্যের বাংলায় অনুবাদের প্রয়োজনটুকুই এই পরাধীন মানসিকতার ইংরেজি ভাষার দাসত্ব করা পণ্ডিত ব্যক্তিদের কাছে আশা করাই দুরাশা। সময়ের অপব্যায় মাত্র।

ইংরেজি সাহিত্য থেকে বাংলায় অনুবাদ নিয়ে এতগুলি কথা বলার একটিই উদ্দেশ্য। যে জাতির অভিজাত সম্প্রদায় ও উচ্চবিত্ত উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণীর ভিতরে ঘরে ঘরে ইংরেজি ভাষার এত রকমারি পণ্ডিত। সেই জাতির অনুবাদ সাহিত্যে ইংরেজি ভাষার সাহিত্যেরই যদি এই অবস্থা হয়। তাহলে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রটা কতটা সংকীর্ণ সে কথা আর বিশদে বলার অপেক্ষা রাখে না। বরং আরও লজ্জার কথা, ইংরেজি বাদে অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে যতটুকু অনুবাদচর্চা হয়ে থাকে, তার বেশির ভাগটাই হয় সেই সেই ভাষা থেকে অনুদিত ইংরেজির বই থেকে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না আর। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ করতে গেলেও অনুবাদককে দারস্থ হতে হয় সেই ইংরেজি অনুবাদের সংস্করণের কাছে।

ইউরোপের কোন দেশের কোন শিক্ষিত জাতি কল্পনাও করতে পারে না, নির্দিষ্ট কোন বিদেশী ভাষায় জাতির শিক্ষাদীক্ষা পরিচালনা করার কথা। আর আমরা কল্পনাও করতে পারি না, মাতৃভাষায় শিক্ষা দীক্ষা পরিচালনার কথা। শুধুমাত্র মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়েই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অনেকে, সকলেই নয়। অনেকে অন্য একটি বা একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। তার জন্য তাকে দুই বছর বয়স থেকে বিদেশী ভাষায় হাত মুখ নাখ চোখ চেনাতে হয় না। কিন্তু স্বনির্বাচিত সেই বিদেশী ভাষায় তিনি এমনই দক্ষ হয়ে ওঠেন যে, সেই দক্ষতায় সেই বৈদেশিক সাহিত্যের একেবারে অন্তর্দেশে প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়ে যান। শুধু তাই নয়। সেই ভাষা থেকে, সেই সাহিত্যে মূল নির্যাসকে নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশের দক্ষতাও তাদের প্রশ্নাতীত। এটিই অনুবাদচর্চার আসল চাবিকাঠি।

একটা গোটা জাতি যখন আপন মাতৃভাষাকে বিসর্জন দিয়ে, সকলেই নির্দিষ্টি একটি ভাষা শিখতে পাগলামো শুরু করে দেয়। শুধুমাত্র অর্থের ঝনঝনানির আশায়। তখন সেই জাতির পক্ষে অনুবাদসাহিত্য চর্চা করা কখনোই সম্ভব নয়। তাকে অনুবাদের জন্যেও নির্ভর করতে হয় সেই নির্দিষ্ট বিদেশী ভাষাটির উপরেই। যে ভাষায় তার আপন অভিভাবক একদিন আহ্লাদে ডগমগ হয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, বলতো বাবা, হোয়্যার ইজ ইউর নোজ! না তাতে বাঙালির কোনদিন নাক কাটা যায় নি। যায় না। তাই অনুবাদসাহিত্য চর্চাও বাঙালির পক্ষে সম্ভব নয়। যেটুকু সম্ভব সেও ঐ ইংরেজির ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খৌঁড়াতেই। তার বেশি কিছু নয়।

১৬ই শ্রাবণ’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s