দাদা আমি সাথে পাঁচে থাকি না

সম্প্রতি রুদ্রনীলের একটি ছড়া সারা বাংলা জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে। কিন্তু রুদ্রর অসাধারণ আবৃত্তিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে মাত্র বছর দশেকের এক বালকের আবৃত্তি। বস্তুত রুদ্রর আবৃত্তির ভিডিওটির থেকেও অধিকতর জনপ্রিয় হয়েছে সেই বালকের আবৃত্তিটি। বয়সে বালক হলে কি হয়, আবৃত্তির দিগন্তে তার দক্ষতা ও সমৃদ্ধি প্রশ্নাতীত।

এবং এত কম বয়সে তার এই অসামান্য পারফর্ম্যন্সে মুগ্ধ আবালবৃদ্ধবনিতা। ফলে রুদ্রর বলিষ্ঠ ছড়াটি বালকের আবৃত্তির মাধুর্য্যে আরও বেশি ছড়িয়ে গিয়েছে দেশ হতে দেশান্তরের বাঙালির ভিতরে। সকলেই বিমুগ্ধ চিত্তে বালকের পারফর্ম্যন্সের তারিফে ব্যস্ত। ব্যস্ত রুদ্রনীলের সাথে বালকের তুলনা নিয়েও। বাঙালি হিসাবে আমাদের সবচেয়ে উপাদেও খাদ্য হলো চানাচুর। আর বিনোদনের থেকে উত্তম চানাচুর আর কি আছে। তাই যেখানেই বিনোদন, সেখানেই আমাদের কাপড় খুলে দৌড়। না কথাটা খারাপ ভাবে নেওয়ার প্রয়োজন নাই। আমাদের এই বিনোদন প্রিয়তার কথা সর্বজন বিদিত। ফলে রুদ্রের নিজের আবৃত্তি ও বালকের এই বিস্ময়কর প্রতিভার বিচ্ছুরণের ককটেলে আমাদের বিনোদনের স্বাদে আনন্দ একেবারে টইটুম্বর।

সেই আনন্দে আমরা সত্যিই ভুলে গেলাম, রুদ্রনীল আমদের গালে সপাটে কেমন চড় কষিয়ে দিয়েছে একটা। একটা গোটা জাতি যখন সম্বিতহারা নৃত্যে মাতলামো করতে থাকে, তখন তার সেই মাতলামো ঘোচানোর জন্য মাঝে মধ্যে এইরকম সপাটে চড় কষানোর দরকার হয়। পরিতাপের বিষয়, বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি বুদ্ধিজীবীর পরিমণ্ডলে সেই চড় কষানোর মতো মেধা চেতনা ও স্বদেশপ্রেম আজ আর বিশেষ অবশিষ্ট নাই। নাই বললেই চলে। এইকারণেই রুদ্র’র এই চড়টা খুবই সময়োপযোগী ছিল। কিন্তু আমাদের গণ্ডারের চামড়া ১৯৪৭ এর পর থেকে পুরু হতে হতে আজ বোধহয় আর চামড়া নাই। নির্মম পাথর হয়ে গিয়েছে। নিস্প্রাণ নিরুদ্বেগ। তাই রুদ্রের চড়টা আমরা কেমন হাসতে হাসতে দন্তবিকশিত করেই বেমালুম হজম করে নিলাম। আমাদের প্রতিদিনের মুখ আয়নায় মুখ দেখতে একটুও লজ্জা লাগলো না। একটুও বীভৎস বলে মনে হলো না নিজেদের সেই হাসি হাসি মুখগুলি? আবৃত্তি উপভোগের আনন্দে গ্রাহ্যই করলাম না, আমাদের চেতনার সেই অসুখের দিকেই রুদ্র আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছে। যে অসুখ কুষ্ঠ রোগের মতো আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে আজ। যার কোন ওষুধ আবিষ্কার হয় নি এখনো। নাই কোন ভ্যাকসিন। একমাত্র যে ভ্যাকসিনটা অন্য সকল উন্নত জাতির রয়েছে, সেই স্বদেশ ও সাজাত্যপ্রেমের মুখাগ্নি করে দিয়েছি আমরা সেই ১৯৪৭ সালেই। বাংলা ভাগ করে তার পিণ্ডদানও করা হয়ে গিয়েছে। ফলে ঐ ভ্যাকসিনে আমাদের আর কোন কাজ হবে না। খুঁজতে হবে নতুন কোন মহৌষধির। যার খোঁজ সম্ভবত রুদ্রনীলের কাছেও নাই।

একটা গোটা সমাজ। একটা গোটা জাতি যখন এই ভাবে নিজের নিজের আত্মসুখের বারান্দায় নির্লিপ্ত হয়ে ঝুলতে থাকে, তখন সেই জাতি, সেই সমাজের ভবিষ্যতও ঝুলে যায় বিলুপ্তির প্রশ্নচিহ্নের সামনে। বহু খণ্ডে বিভক্ত এই বাংলা ও বাঙালির সমাজও তেমনই ঝুলে আছে আজ। কেউ জানে না সামনের ছবিগুলি দেখতে কেমন হবে। কেউ উদ্বিগ্নও নয় সেসব নিয়ে। মানুষের এই নিরুদ্বেগকেই ঠাস করে চড়িয়ে দিয়েছে রুদ্রনীল। কিন্তু লজ্জা শরমের ধার না ধারতে ধারতে আমরা আজ এমনই বেহায়ায় পর্যবসিত হয়ে গিয়েছি যে, সেই চড় খানিকেই বিনোদনের পসরা করে নিয়ে দারুণ একটা সময় উপভোগ করে নিলাম। পরস্পর।

প্রায় দশ কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের মহাকাব্যিক পথহাঁটা আমাদের স্পর্শ করে নি। করলে আমরা পাঁচ মিনিট ধরে থালা বাজাতে পারতাম না। পারতাম না নয় মিনিট ধরে আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে পটকা ফাটিয়ে করোনা তাড়ানোর মুর্খমিছিলে সামিল হতে। প্রায় গর্দভের মতো হাঁ করে আকাশ থেকে সরকারী পুষ্পবৃষ্টি দেখে উৎসাহে উদ্দীপনায় সরকারের বন্দনায় না মেতে আমরা জবাবদিহি চাইতাম সরকারী ব্যর্থতার। নির্বাচিত সরকারের দায় থাকে জনতার দরবারে জবাবদিহি করার। কিন্তু জনতা যখন সেই কথা বিস্মৃত হয়ে যায়, তখন দেশ লুঠ হয়ে যেতে বেশি দিন দেরি লাগে না। উল্টে আমরা তখন গণ্ডে পিণ্ডে গিলে আরামের ভাতঘুম দিয়ে উঠে সান্ধ্যলাইভের আসরে নিজের নিজের গুণপনা জাহির করতেই ব্যস্ত। রুদ্রনীলের কথায়, এই সেই সাতে পাঁচে না থাকা পাব্লিক।

কিন্তু আমরা বিনোদনে আছি। জলসায় আছি। সান্ধ্যলাইভে আছি। লকডাউনে অনেক কিছুই বন্ধ। ঘরে বসে বসে হাতে পায়ে হাজা ধরে যাচ্ছে। তাই অনলাইনে নতুন করে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাচ্ছি। লাইক আর কমেন্ট গুনে গুনে, নিজেদের গুণপনার বহরে নিজেরাই আশ্চর্য্য হয়ে যাচ্ছি। আর তারই সাথে করছি আরও একটি জরুরী কাজ। সেটি একটি সামাজিক পরিসেবা। পরস্পরের পিঠ চাপড়ানো। বুদ্ধি আমদের ক্ষুরধার। তাই জানি, নিজেকে সুখে রাখার উপায়। যত বেশি পরস্পরের পিঠ চাপড়ানো যাবে, তত বেশি আপন পিঠে সুখানুভুতির বন্যা বইতে থাকবে। সাতে পাঁচে না থাকলে কি হয়, এই বিষয়ে আমরা সাতেও থাকি পাঁচেও থাকি। যতক্ষণ পিঠচাপড়ানির উপভোগের মুহুর্তগুলি মনের মণিকোঠায় বাঁধিয়ে রাখতে পারি। ততক্ষণই সুখ।

আত্মসুখের পরিমণ্ডলে সত্যই বাঙালি এমন একটি জাতি, যে জাতি বাকি সব কিছু ভুলে থাকতে পারে। ফলে ‘দাদা আমি সাতে পাঁচে থাকি না’- তারাই বলে, যাদের দিন কাটে আত্মসুখের পরিমণ্ডলে। নিজেকে নিয়েই মেতে থাকতে। তাই মনে হয় বাঙালির সম্বিত ফেরাতে রুদ্রনীলের পথে এগোনোর উপায় নাই। এগোতে হবে অন্যপথে। অনেকটা সেই পাগলা দাশুর চিনেপটকায় আগুন ধরানোর মতো। নিদ্রাগত পণ্ডিতের সুখনিদ্রায় আগুন ধরাতে হবে। সেটা বুঝেছিল পাগলা দাশু। আর বুঝেছিলেন সুকুমার রায়। তাই চিনেপটকার দাওয়াই দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও গোল। আমরা পাগলা দাশুর কাণ্ডে পেট চেপে ধরে গড়াগড়ি খেয়ছি বিস্তর। কিন্তু সুকুমার রায়ের ঔষধিটার খোঁজ করি নি।

খোঁজ করবোই বা কি করে? আর খৌঁজ করবেই বা কে? নিদ্রাগত সুখনিদ্রায় মগ্ন পণ্ডিত মশাই নিজে তো আর তার আত্মসুখে আগুন ধরাতে যাবে না? গোটা সমাজটাই তো সেই পণ্ডিত মশাইয়ের মতো সুখনিদ্রায় মগ্ন। মগ্ন বলেই না রুদ্রনীলের সপাটে চড়টাও কেমন বেমালুম হজম করে ফেললো। আত্নসুখের ঝুলবারান্দায় ঝুলেই উপভোগ করলো বিনোদনের পসরা বানিয়ে। যে মানুষ নিজের গালে পড়া সপাটে চড়কেও বিনোদনের সামগ্রী বানিয়ে হাসি তামাশায় সময় উপভোগ করতে পারে, তার সম্বিত ফেরানো সত্যই সহজ কথা নয়। কিন্তু আরও বড়ো প্রশ্ন, সেই সম্বিত ফেরাবে কে? এদিকে তো ঠগ বাছতে গাঁ উজার। গোটা জাতিই সম্বিতহারা নৃত্যে আত্মসুখের মদে মাতলামোয় মগ্ন। একটা গোটা জাতির মাতলামোয় চিনেপটকা ফাটাবে তবে কে?

তবে কি সুকুমার রায়ের গল্পের মতোন এই বাংলাকেও এক আধটা কিংবা একাধিক পাগলা দাশুদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে? কবে কোন আতুঁর ঘরে জন্ম নেবে পাগলা দাশুরা। না, এই সময়ে আমাদের এই সমাজে কোন পাগলা দাশুর খোঁজ নাই এখনো। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে তারপরেও এই কুম্ভকর্ম জাতির ঘুম ভাঙানো কি সত্যই সম্ভব? এক বা একাধিক পাগলা দাশুদের পক্ষেও? সেই উত্তর দেবে ভাবীকাল। সেই উত্তর জানা নাই আমাদের। জানা নাই রুদ্রনীলেরও। তাই মদন তাঁতির মতো শূন্য তাঁতে মাকু চালিয়ে যাবে এক আধজন রুদ্রনীল। নিঃসীম অন্ধকারে সেইটুকু আলোর রেখাও যে শেষ অব্দি দেখা গেল, তাই বা কম কি? পাগলা দাশুদের জন্মানোর জন্যেই এইরকম অনেক অনেক রুদ্রনীলদেরকে প্রয়োজন এখন এই বাংলায়। কাঁটাতারের দুই পারেই। যতদূর বাংলা ভাষা। ততদূর পরিসরেই।

২৫শে আষাঢ়

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s