ছাতাকাহিনী

“ছাতা সারাই ছাতা সারাই’ হাঁক শুনে হঠাৎ ঝটকা লাগলো একটা। সকালে উঠে কেবল চায় চুমুক দিচ্ছি। জানলার পাশ দিয়ে ছাতা সারানোর ডাক। যদিও আমার ছাতাও নাই। সারাইয়েরও দরকার নাই। তবু ঝটকা একটা লাগলো জোর।  সাধারণত এযুগে ছাতা আর কজন সারায়?

পুরানো হলে ভেঙ্গে গেলে, চার পুরুষ মাথায় ধরে থাকা মহেন্দ্র দত্ত কি কে সি পালের শরণাপন্ন হয় মানুষ। ঠিক যেমন ছাতা হারিয়ে গেলেই পা বাড়াতে হয় সেই দিকেই। ছাতা বলতে প্রথমেই ছাতা মাথা অনেক কিছুই মনে হয়। আশ্চর্য্য হয়ে দেখলাম চোখের সামনে হরেক কিসিমের ছাতা। এক এক ছাতার এক এক দর। কত মানুষের মাথায় কত রকমের ছাতা। না ঠিক করে বলা হলো না হয়ত। হরেক ছাতার তলায় নানান ধরনের মানুষ। আমাদের নাগরিক জীবনে পথে বিপথে ছত্রপতির অভাব নাই। তবে একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে অধিকাংশ ছত্রপতিরই মাথায় ছাতা ধরে আছেন অন্য কেউ। ঠিক যেন রাজরাজেশ্বর। মহলায় টহল দিতে বেড়িয়েছেন। পাশে পাশে ছাতা ধরে চলেছেন অন্যজন। না সেই দিন আর কোথায়? এখন যুগ পাল্টিয়ে গিয়েছে। ছাতা ধরার ধরণও গিয়েছে বদলিয়ে। আগে ছত্রপতিদের মাথায় ছাতা ধরতো হুকুমের দাসেরা। এখন ছত্রপতিদের মাথায় ছাতা ধরে থাকেন যিনি বা যাঁরা, তাঁর বা তাঁদের হুকুম মতোই ছাতার তলায় সমবেত হয়ে পথ চলতে হয় আমাদের। আম জনতার।

যেমন ধরুন স্ত্রীর মাথায় স্বামীর ছাতা। সেই ছাতার তলায় নিজ কন্যাকে গছিয়ে দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের রাতের ঘুম নষ্ট। শক্তপোক্ত ছাতা হতে হবে। ছায়া দেবে মনোরম। ঝড়বৃষ্টি রোদ তাপ উত্তাপ থেকে রক্ষা করার মতোন হতে হবে। আবার সে ছাতার সামাজিক প্রতিপত্তি নামযশ থাকাও জরুরী। যত বাহার তত শোভা। তবেই না ছাদনাতলায় কন্যা সম্প্রদান! যাও মা এবার তোমার ছাতার তলায় স্থিতু হও। কিন্তু ছাতা যে কন্যার হাতে থাকবে না! ছাতার যে নিজস্ব মালিকানা রয়েছে। ছাতা যেদিকে চলবে কন্যাকেও যে স্ত্রীরুপে সেই পথেই এগোতে হবে। না না, মাথা থেকে ছাতা সরে গেলে কন্যাসহ পিতামাতার মাথায় বজ্রপাত! অর্থাৎ, মানিয়ে নাও মা। মানিয়ে নাও। ছাতার তলায় থাকতে থাকতে তুমিও ছাতা হয়ে ওঠো। ছাতার লাঠি যার হাতে, তাঁরই অন্ধভক্ত হয়ে উঠে দেখ সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে।

স্ত্রীপুত্রকন্যা নিয়ে দুদণ্ড শান্তিতে বাস করতে চান। করুন অসুবিধে কি? কিন্তু না, মাথায় কোন ছাতা না থাকলে তো হবে না মশাই। চৌখশ একটি ছাতার তলায় তো মাথা ঢোকাতেই হবে বন্ধু। মাথার উপরে ছাতা না থাকলে চলবে? কি মুস্কিল! পড়শী বদমায়েশি করছে? বাগে আনতে পারছেন না? আগে দেখুন মাথার উপরে সঠিক ছাতাটা আছে কিনা। না থাকলে ঠিক ছাতার তলায় ঠিক সময়ে মাথা ঢুকিয়ে দিন। সব ব্যাটা জব্দ হয়ে যাবে। না, তাই বলে আবার যদি ভেবে বসেন, মাথার উপরে ছাতা আছে নির্ভাবনায় দিন যাবে, তবেই হয়েছে। হাওয়া অফিসের দিকে নজর রাখতে হবে না? কোন ছাতারই ভ্যালিডিটি লাইফটাইম নয় কিন্তু। আজ আছে কাল নাই। ফলে আপনাকেও ছাতা বদল করতে হবে সময় বুঝে। নয়তো যে ব্যটাদের ছাতার তলায় বসে জব্দ করেছিলেন একদিন। তারাই আপনাকে বুঝে নেবে নতুন দিনে। ফলে সময় থাকতে সাবধান হতে হবে। দরকারে কুকুরের মতো কান খাঁড়া রাখতেই হবে। প্রয়োজনে নতুন ছাতার পা’ চাটতে হলেও পিছুপা হলে চলবে না। হলেই দুই পাশে অতলান্ত খাদ।

হ্যাঁ ভ্যালিডিটি অনুসারে যিনি সময় মতো সঠিক সঠিক ছাতা ঠিকঠাক বেছে নিতে পারবেন, তাঁকে আর পায় কে। আইন আদালত বলুন, শরীর স্বাস্থ্য বলুন, শিক্ষা চাকরি বলুন, ব্যাবসা কিংবা ধান্দাই বলুন। সব ম্যানেজ হয়ে যাবে প্রভুভক্ত সারমেয়র মতো ল্যাজ নেড়ে যেতে পারলেই। তবে ওদের মতো আত্মসম্মানে মুখ গম্ভীর করে নয়। একেবারে বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা হাসিহাসি মুখে। যেমন ছাতা বেছে নেবেন, তেমন ছাতার ধর্ম মেনেই চলতে হবে। এটাই দস্তুর। যস্মিন দেশে যদাচার। হ্যাঁ মনে রাখবেন, ছাতা বাছার অধিকার আপনার। ব্যাস ঐটুকুই। এবার ছাতার হুকুমের দাস হয়ে মাথা মুড়িয়ে নিন ছাতার তলায়। তাহলেই জীবন সুখের হবে মাথা মুড়ানোর গুণে!

ইতিহাসের অনুসন্ধান যাঁরা করেন তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন আমাদের দেশে ছাতা আমদানীর সঠিক ইতিহাস। তবে জানাশোনা ইতিহাস অনুসারে খোদ বিলাতী প্রভুর হাত ধরে দুইটি বিশেষ ছাতার আমদানী হয়েছে এই দেশে। প্রথমটির গালভরা নাম ধনতন্ত্র। যেটি নিয়ে আমরা সকলেই মনে মনে স্বপ্ন দেখি এক একজন টাটা বিড়লা হয়ে ওঠার। এখন অবশ্য প্রযুক্তির যুগ। স্বপ্নে এখন আম্বানী আদানী। আর গালভরা দ্বিতীয় ছাতাটির নাম গণতন্ত্র। না এই ছাতার তলা থেকে যিনি বেড়িয়ে যেতে চাইবেন, তাঁর কপালে নির্ঘাৎ দুঃখ আছে। হয় তিনি দেশদ্রোহী। নয় বিশ্বাসঘাতক না হলে নিশ্চিত মাওবাদী। ফলে দ্বিতীয় ছাতাটির তলা থেকে সজ্ঞানে কেউ আর বেড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন না। বরং বেশি করে এই ছাতার তলায় ঢুকে করেকম্মে খাওয়ার সলুকসন্ধান করে থাকেন। একটু যাঁরা চারিদিকের হাওয়ার খবরা খবর রাখেন টাখেন, তাঁরা জানেন। এই দুই বিশেষ ছাতার দেখভালের প্রধান ঠিকাদার থাকেন পৃথিবীর উল্টো পিঠে। একটু এদিকে ওদিকে হেলারও উপায় নাই ছাতা দুটির। হেলে পড়ার মতো সামান্য হাওয়াও যাতে না ওঠে, সেদিকে প্রখর নজর দিবারাত্রি। ছাতা উল্টিয়ে যাওয়া তো কল্পনাতীত। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর চাইলেও কোন লাভ নাই।

সে এক দিন ছিল। অনেকের কাছেই হয়তো আজও নস্টালজিক সেসব দিনের কথা। চার পুরুষের মহেন্দ্র দত্ত কিংবা কে সি পালের ছাতা নয়। সে ছিল কার্ল মার্কসের ছাতা। কত লোক যে সেই ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়েছিল দেশবিদেশে! নিন্দুকেরা অবশ্য বলবেন। আশ্রয় না ছাই। মাথা মুড়িয়ে ছিল আসলেই। তা সে যাই হোক। ইতিহাস কখনো মিথ্যা বলে না। বর্তমান অনেক সময়েই ইতিহাসকে টুপি পড়িয়ে আড়ালে রাখতে চায়। সে চাক। তাই নিয়ে বাকবিতন্ডা করেও লাভ নাই। সময়ের আমফান এসে আছড়ে পড়লে কোথায় যাবে সেই টুপি আর টুপির কারিগর! তো সেই মার্কসের ছাতার তলায় বসে গোটা পৃথিবীর অনকটাই বদলিয়ে দিয়ে গিয়েছিল কিছু তথাকথিত মাথা মুড়ানো মুণ্ডু। যার সুফল আজও পাচ্ছে ধনতন্ত্রের ও গণতন্ত্রের ছাতার তলায় আটকা পড়া অনেকেই। কিন্তু সে আর কে স্বীকার করে আজ। বরং সেই সুফলের কুফল থেকে ধনতন্ত্রকে আরও কি করে বিশুদ্ধ করে তোলা যায়, তারই গবেষণায় আজকের ছাতার মালিকরা।

তবে সবচেয়ে প্রাচীন ছাতার কথাই যদি বলতে হয়। তবে সাম্রাজ্যবাদ আর পিতৃতন্ত্রের ছাতার কথা না বললে চলবে কি করে? সব ছাতার সেরা এই দুই ছাতা। আজও সমান কার্যকরি। আজও সমান শক্তিশালী। একফোটাও ফুটো খুঁজে পাবে না তো কেউ। মাঝে কত ছাতা এলো গেল। কত ছাতা ফুটো হলো। কত ছাতা উল্টালো। কিন্তু হাজার হাজার পুরুষ মাথায় ধরে আছে এই দুই ছাতা।

ছাতাকাহিনী এখানেই শেষ করতে পারলে বাঁচা যেতো ভাবছেন? তাহলেই হয়েছে। কত ধরণের আরও কত ছাতার গপ্প তো বলাই হলো না এখনো। দেশভক্তির ছাতা। দেখলেন না পুলওয়ামা কাণ্ডে কেমন নিরঙ্কুশ সাফল্য এনে দিল! এখন আবার গালওয়ান কাণ্ডে কেমন নতুন করে মোচর দিয়ে উঠছে। আসুন আসুন দেশভক্তির ছাতার তলায় সমবেত হয়ে নিজেদের ছাতির মাপ নিয়ে নিন। কে কত বড়ো দেশভক্ত বীর। এরপর ধরুন রামের ছাতা। আদর করে জয়শ্রীরাম স্মরণ করে মাথা ঢোকাতে হয় যে ছাতার তলায়। না এটি কিন্তু চার পুরুষের ছাতা বলে ভাবলে ভুল হয়ে যাবে। এটি একেবারে হাল ফ্যাশনের ছাতা। কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত। দরকারে একেবারে পিটিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেওয়ার মতোন শক্তিধর। ছাতাপেটার ফলে সব ব্যাটা কেমন মিহি সুরে মিনমিন করছে চারদিকে তাকিয়ে দেখুন। তাহলেই টের পাবেন। এর আবার মাসতুতু ভাই। বিদ্বেষ বিষ চাষো ছাতা। দেখলেন তো তার দৌড়? চব্বিশ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি পুড়লো। শতাধিক বুলেট বিদ্ধ হয়ে কত জন চিৎপটাং! ওদিকে আমাদের শতাব্দী প্রাচীন বিদ্বেষ বিষ নাশো ছাতা, সাম্প্রদায়িক ঝড়ে সেই যে ১৯৪৭এ উল্টে পাল্টে কুপোকাৎ হলো, আর নট নড়নচড়ন।

থাক লিস্ট আর বাড়িয়ে লাভ নাই। একেবারে দ্রৌপদীর শাড়ীর মতোন। বাড়তেই থাকবে বাড়তেই থাকবে। আপাতত লাল ছাতা দ্বৈপায়নে দুর্যোধনের মতো ঊরুভেঙ্গে পথে বসেছে। নীলশাদা ছাতা শোভা ছড়াতে ছড়াতে কখন যে গেরুয়া ছাতার তলায় গিয়ে মুখ লুকাবে সে কথা ভবিষ্যৎই জানে। আপাতত বাংলা জুড়ে ছাতায় ছাতায় যুদ্ধ। প্রাণ যায় ছাতার তলায় মাথা মুড়ানো মুণ্ডুগুলোরই শুধু। ছাতার মালিক মালকীনদের তাতেই শোভা বাড়ে। মুখ খুলে যায় বক্তৃতার। তার ধুয়ো তুলতে ছাতার তলায় সমবেত হন ভদ্রমহোদয়গণ! আমাদের ছাতা আপনাদের ভালোর জন্যেই প্রস্তুত। আসুন দলে দলে যোগ দিন।

তাই এসব ছাতার কথা থাক আপাতত। শুধু দেখে নেওয়া যাক। কোন কোন ছাতাগুলি হারিয়ে ফেলেছি আমরা? সেই কবেকার গৌতম বুদ্ধের বাড়িয়ে দেওয়া ছাতাখানি। তারপর ধরুন শ্রীচৈতন্যের ছাতা। রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের ছাতা। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ছাতা। মাস্টারদা নেতাজীর ছাতা। এসব ছাতাই আমরা যত্ন করে হারিয়ে ফেলেছি ১৯৪৭এর আগেই। ট্রেন থেকে খালি হাতে ছাতা ফেলে নেমে পড়ার মতোন। ট্রেন গিয়েছে চলে। সময়ের চলে যাওয়ার সাথে হারিয়ে গিয়েছে এসব ছাতা। না, অপেক্ষা করেও আর লাভ নাই । সময়ের মতোই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে  চলে যাওয়া ট্রেন আর ফিরে আসে না। সময়ের আবর্তনে আবার কবে কোথায় কখন এই দরের ছাতা তৈরী করে বাড়িয়ে দেবে কোন মহাপুরুষ, মহাকালও বোধহয় সেকথা জানে না।

শিশু বয়সে বাবা মায়ের হাত আমাদের হাতে আবার কতগুলি কচি কচি ছাতা ধরিয়ে দিত। সততা। ন্যায় পরায়ণতা। আদর্শ। বিবেক সংবেদনশীলতা। মায়া মমতা মানবতা ইত্যাদি ইতাদ্যি। আশা করতেন আত্মজরা এই সব ছাতার তলায় সুরক্ষিত থাকবে। অন্যকেও সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু ভেজাল সমাজের পুষ্টিতে পুষ্ট হতে হতে আমরা যত মাপে বাড়তে থাকি, ততই বাবা মায়ের দেওয়া এই ছাতাগুলি আমাদের মাপের সাথে এঁটে উঠতে না পেরে ফুটিফাটা হতে থাকে। একদিন অবহেলায় ফেলে রাখা জীর্ণ বস্তুর মতো পড়ে থাকে বাড়ির আনাচে কানাচে। না সেগুলি সারানোর মতো দক্ষ কারিগর এই দেশে এই সমাজে এই কালে খুঁজে পাওয়া যাবে না আর। জানলার পাশ দিয়ে যতই হেঁকে যাক না কেন ছাতা সারাই ছাতা সারাই বলে।

১১ই আষাঢ়

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s