নিরোলজি

সম্রাট নিরো। নামটি শুনলেই বিশেষ একটি অনুভতি হয়। হবেই। কালে কালে কত কাল গেল। কিন্তু এই অনুভুতির মৃত্যু নাই। নিরোও তাই অমর হয়ে আজও প্রাসঙ্গিক খুবই। আচ্ছা নিরো কি সত্যই শিল্পী ছিলেন? প্রশ্নটা মনে হচ্ছে খুবই। একজন শিল্পীর অন্তিম দায়বদ্ধতা কার কাছে? তাঁর শিল্পসত্তার কাছেই তো নাকি? নাকি শিল্পের কাছেই? উত্তর যাই হোক না কেন, শিল্পীর অন্তিম দায়বদ্ধতায় শিল্প ও শিল্পসত্তার ভুমিকাই প্রধান। এ কথা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না। নয়তো সেই ফটোগ্রাফার ভদ্রলোকের কথাই যদি ধরি, তিনিও তো দুর্ভিক্ষ তাড়িত ক্ষুধার্ত মরণাপন্ন শিশুটির পাশে শিশুটির মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শকুনের ছবি তুলতেই ব্যস্ত ছিলেন, শিশুটিকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার বদলে। যে ছবির জন্য আবিশ্ব খ্যাতি জুটে ছিল শিল্পীর। শিল্পের প্রতি এই দায়বদ্ধতাই একজন মানুষকে পরিপূর্ণ শিল্পী করে তোলে। সমগ্র রোম নগরী যখন পুড়ছে। লক্ষ লক্ষ নরনারী শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা বাঁচার জন্য পুড়তে পুড়তে দিকবিদিক ছুটোছুটি করছে, হয়ত সেই সময় মানুষের অন্তিম আর্তনাদই শিল্পী নিরোর বেহালার ছড়ে উঠে আসছিল মহাজাগতিক ঢেউয়ের মতোন! কি করবেন শিল্পী? জলন্ত মানুষের অন্তিম আর্তনাদকে তাঁর শিল্পীসত্তায় ধারণ করতে বেহালায় সুর তুলবেন নাকি রোমের নাগরিকদের প্রাণরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়বেন? ইতিহাসে জানা যায়, সম্রাট নিরো নিজেই নাকি রোমে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। জানা যায় না, মানুষের অন্তিম আর্তনাদের মর্মন্তুদ বেদনার সুরকে নিজ শিল্পীসত্তায় ধারণ করতেই তিনি এই কাজ করেছিলেন কিনা।

নিরোর কথাই আজ বেশি করে মনে পড়ছে ঘন ঘন। ফেসবুক খুললেই আমার চোখের সমানে দেখা দিচ্ছে বঙ্গসংস্কৃতির মহামিছিল। মিছিল চলেছে গোটা লকডাউন পিরিয়ড ধরেই। ওয়ালে ওয়ালে। কেউ গাইছেন। কেউ পাঠ করছেন। কেউ নাচছেন। কেউ আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। সবটাই ফ্রী অফ কস্ট। বাঙালির সাংস্কৃতিক দিগন্ত জুড়ে আজ সংস্কৃতির বান ডেকেছে। এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী। সকলেই তরী ভাসিয়ে দিতে চাইছেন। যাঁর যা আছে। যাঁর যেটুকু সম্বল। তাই নিয়ে অকপটে। আমার যে সব দিতে হবে সে’তো আমি জানি। সকলেই নিজেকে উজার করে দিতে চাইছেন। ওয়ালে ওয়ালে লাইভ টেলিকাস্ট। ফেল কড়ি মাখো তেল নয়। টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়ানো নাই। রাত হয়ে গেলে বাড়ি ফেরার গাড়ী পাওয়া যাবে কিনা, সে চিন্তা নাই। শুধু সকাল সন্ধ্যা ফেসবুকে ঢুঁ মারলেই দেদার ফূর্তি। সাজসজ্জা থেকে শুরু করে ভালো ভালো খাদ্যখাওয়ার নিত্য নতুন রেসিপি। গান কবিতা গল্প। সাথে সুস্থ থাকার হাজারো টিপস। সবই বিনামূল্যে। বিনামূল্যে ওয়েব পত্রিকা। সাপ্তাহিক মাসিক ত্রৈমাসিক। সহিত্য সংস্কৃতির দিগন্ত জুড়ে শুধুই মননশীলতার চর্চা। নান্দনিকতার চর্চা। সৃজনশীল বাঙালি, লকডাউনের অবসরে ঘরে বসেই এত কিছু করে চলেছে। নমস্কার। আমি অমুক। তমুকের অনুরোধে আজ আপনাদের স্বরচিত কবিতা শোনাতে হাজির হয়েছি। নমস্কার। তমুকের অনুরোধে অমুক গোষ্ঠীর সৌজন্যে আজ আমি আপনাদের সামনে সঙ্গীত পরিবেশন করতে হাজির হব। রাত্রি ঠিক আট ঘটিকায়। আপনারা মনে করে আসবেন কিন্তু।

আসবো তো নিশ্চিত। লাইক দিতে হবে না! কমেন্ট করতেও হবে তো। তারপরে শেয়ারও করতে পারি। মন মেজাজ ফুরফুরে থাকলে। আর মন মেজাজ ফুরফুরে থাকবে নাই বা কেন? অন লাইন হলেই এমন সস্তার বিনোদন হাতে গরম হাতে হাতে প্রাপ্তি। তমুকের ফেসবুক লাইভে হাজির হয়ে তাঁর সুললিত কন্ঠে নিজের নাম উচ্চারিত হলে দিলখুস। সারাদিনে বিশ্ব জুড়ে করোনার বলি হলো কয়জন, সে হিসাব তো জানিই। কিন্তু তাই বলে মৃত্যুর কাছে মরার আগেই হেরে যাবো না নিশ্চয়। তাই আজকের ফেসবুক লাইভে আমিও থাকছি। কালকের ওয়েব পত্রিকা প্রকাশেও প্রকাশিত হচ্ছে আমার সাম্প্রতিক করোনাকবিতা। করোনায় মৃত্যুর হিসাব লাফিয়ে লাফিয়ে যত বাড়ছে, আমরাও তত মানসিক ভাবে দার্শনিক হয়ে উঠছি। মৃত্যু মহামারীকে আমরাও মহাজাগতিক ক্যানভাসে উপলব্ধি করার শক্তি অর্জন করছি দিনে দিনে। জীবন মৃত্যু পায়ে’র ভৃত্য। আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে। না, নিজের বাড়িতে করোনা হানা দিলে কি হবে জানি না। বলতেও পারি না। শুধু জানি মৃত্যু মহামারী প্রকৃতির বিধান। কালে কালে প্রকৃতি নতুন করে নিজেকে একটু ঝেড়েঝুড়ে নেয়। এ আর নতুন কথা কি। নরবর্ষের প্রাক্কালে কিংবা শরৎ আসলে বাড়ী ঘরদোর ঝেড়ে নেওয়ার মতন আর কি। অদরকারী পুরানো জিনিস ফেলে দেওয়ার মতন। বাতিল করো। বাতিল করো। যা কিছু কাজে দেয় না। যত ফেলে দেওয়া যায়, তত ঘর পরিস্কার হয়। প্রকৃতিও মাঝে মধ্যে তেমনই ঘর পরিস্কার করে। মৃত্যু মহামারী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যা প্লাবন ভুমিকম্প। যে মরার সে মরবে। যে বাঁচার সে থাকবে। এই নিয়ে আর বেশি চিন্তা করে কি হবে?

তাই আমরাও এই সব নিয়ে ততটা চিন্তিত নই। যতটা চিন্তিত আজকে ফেসবুকে লাইভে আসবো ঠিক কোন পোশাকটা পড়ে। গান গাইতে হলে দিনে দুইএকবার সামান্য উষ্ণজলে গার্গল করে নিয়ে গলাটা একবার সেধে নেওয়া ভালো। কবিতা পাঠের আসর থাকলে, বেছে নিতে হবে আজকের কবিতাগুলি। কোন কোন কবিতায় আগে বেশি লাইক কমেন্ট পড়েছিল, সেইগুলিই বেছে নেওয়া বরং ভালো। আজ যদি লেখা পাঠানোর শেষ ডেট হয় তো সর্বনাশ। আজকেই লেখাটা শেষ করে ফেলতে হবে তাড়াতাড়ি। হ্যাঁ, ওরা যারা দিনের পর দিন রাতের পর রাত মাইলের পর মাইল জুড়ে পায়ে হাঁটার নতুন মহাকাব্য রচনা করলো গত দুই মাস ধরে, তার উপরেই লিখতে হবে পরের কবিতাটি। শব্দের অক্ষর বিন্যাসে ধরে ফেলতে হবে নিজের মানবিক মুখের ছবিটুকুকে।

নিজের আত্ম প্রতিকৃতি রচনার এমন জনজোয়ারে আমরা তো আমাদের মানবিক মুখভঙ্গির কোলাজ নির্মাণেই অধিকতর সচেতন। ব্যস্ত তার বাস্তবিক রূপায়নে। যে মানুষটি এই মাত্র মারা গেল করোনায়। যে শিশুটি হঠাৎ অনাথ হলো। যার ঘরে কেউ হাসপাতালে। কেউ কোয়ারিনটিনে। কেউ বা মাইল মাইল রাস্তার মাঝে আর একটু পা চালিয়ে ভাই। আমফানে যার বসত বাড়িটিই হওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। শেষ সম্বল বলতে হৃদপিণ্ডের ঢিপ ঢিপ আওয়াজ। আমার কবিতার লাইন তো তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়েই এগিয়ে চলছে নাকি। আমার লাইভে যে গানই শোনাই না কেন, সেই সুরে মহাজাগতিক বেদনার গানও কি বাজে না? তাই হয়? করোনা আক্রান্ত আমফান বিদ্ধস্ত এই বাংলায় আজকের ফেসবুক লাইভে যদি কেউ নিরোর মুখ দেখতেও পান, বলুন তো সত্যি করে। ঠিক কি করতে পারি আমি? আমরা? কি করতে পারতাম? ইতিহাসের পরবর্তী পাতায় আমাদের নাম নিরোর মতোন খ্যাতি পাবে কিনা জানি না। কিন্তু আমরা, আমাদের সৃজনশীল চেতনার দিগন্তে আমাদের শিল্পী সত্তায় এই সময়ের বেদনাকে ধরতে পারি বা না পারি, আমরা আমাদের শিল্পীসত্তার কছে দায়বদ্ধ কিনা, সেটিও কম মূল্যবান নয়। আজকের ফেসবুক লাইভ। আজকের কবিতা গান। আজকের নাচ। আজকের আড্ডা। সবই কিন্তু জীবনেরই উদ্বোধন বন্ধু। কেউ যদি তাকে নিরোর বেহালার ছড়ের সাথে মিলিয়ে ফেলতে চান, তবে সেটি তাঁর সমস্যা। আমাদের নয়। আমাদের নোঙর নিজ শিল্পীসত্তার কাছে।

বেশ। খুবই ভালে কথা। মানুষের নোঙর তার নিজ শিল্পীসত্তার কাছে হলে তো সত্যই আর কোন সমস্যা থাকে না। সম্রাট নিরো জীবিত থাকলে আজ সত্যই আমাদের আশীর্বাদ করে যেতেন প্রাণভরে। তারপর আর বলার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু তার ভিতরেই আরও যেন একটা বেয়াড়া প্রশ্ন দাপিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে অহরহ। না, সকলের হয়তো সে সমস্যা নাই। কিন্তু কোন কোন বেআক্কেলে মানুষের সেটাই আবার মহা ফ্যাসাদ হয়ে দেখা দিতে পারে। মানুষের নোঙর তাঁরা শিল্পীসত্তায়? তাঁর মনুষ্যত্বে নয়? তাঁর মানবিক বোধের অতলান্ত গভীরে নয়? তাঁর সহমর্মীতার অনন্ত দিগন্তে নয়? কারণ, মানুষের নোঙর যদি এইসব স্থানেই সজীব থাকে, তাহলে তো সেই বিখ্যাত ফটোগ্রাফার নিজের ক্যামেরা বেচে দিয়েও মরাণাপন্ন শিশুর মুখে সঞ্জীবনী অন্ন তুলে দিয়ে প্রাণ রক্ষার অন্তিম একটা চেষ্টা করতে পারতেন। তাই না? নিজের সাধের বেহালা আগুনে নিক্ষেপ করে আগুন থেকে রোমবাসীকে উদ্ধারে ঝাঁপ দিতেন সম্রাট নিরো? ঠিক যেমন ইতিহাসের পাতা জুড়ে আমরা দাবি করে এসেছি শত শত বছর ধরে। অথচ সেই আমরাই ভেন্টিলেটরে মৃত্যুর সাথে মুখোমুখি মৃতবৎ সহনাগরিকদের কথা ভুলে ফেসবুক লাইভে দিব্বি গেয়ে শোনাচ্ছি, মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে। কিংবা সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা। ঠিক যখন পরিশ্রান্ত পা’য়ে একটু জিরিয়ে নিতে রেল লাইনে মৃত্যুর ঠিকানা জোগার করে ফেলবে পরিযায়ী শ্রমিকরা।

না, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য দরদ যে একে বারে উথলে উঠেচে। তা ঠিক নয়। শ্রমিকদের এই দুর্দশায় কারুর রাতের ঘুমও নষ্ট হয়নি। সম্পূর্ণ ম্যানমেড এই ডিজাস্টার যে সব নিরোদের অঙ্গুলি হেলনে হয়েছে, আমরা যে তাদেরকে আর কোনদিন কোন নির্বাচনে ভোট দেবো না, তাও নয়। আমরা যে সেইসব নিরোদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে উঠে পড়ে লাগবো, তাও নয়। কারণ একটাই কাক কখনো কাকের মাংস খায় না। তাই নয় কি?

২৪শে জ্যৈষ্ঠ’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s