আঁশটে দর্শন

দোকানীর কাছ থেকেই মাছ কাটিয়ে নিয়ে আসি। আজও কোন ব্যাতিক্রম হয় নি। কিছুটা সস্তায় রুই মাছ কাটিয়ে বাড়ি ফিরেছি। সাথে মাছের ডিম ফ্রী। মাছের ডিমের প্রতি আমার একটু বাড়তি আবেগ বর্তমান। তাই মন বেশ ফুরফুরে। এখন করোনা কাল। তাই বিশেষ যত্নে মাছ ধোয়ার ব্যবস্থা নিতেই হচ্ছে। তাড়াহুড়োয় দোকানী কোন রকমেই মাছের আঁশ ছাড়িয়ে দিয়েছে। তাই জল দিয়ে ধুতে গিয়েই মাছের আঁশের দিকে নজর পড়ল। আর কি আশ্চর্য্য! প্রায় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো দশা! ক্রমেই চোখের সামনে এক একটি বন্ধ দরজা খুলে যেতে লাগলো। পরপর। সামান্য মাছের আঁশও যে কত অসামান্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, টের পাই নি এতদিন। মাছের আঁশ পরিস্কার করতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল নধরকান্ত রুই। কোনদিন কি সত্যই খেয়াল করেছি? এই সামান্য রুই। বাংলার পুকুর বিল মাছের ভেরি জুড়ে যাদের রাজত্ব। চৌদ্দ পুরুষ আগের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের রাজত্ব আজ নাই ঠিকই। কিন্তু মেজাজটা এখনো সেই রুই কাতলা জুড়েই। অথছ সেই রুই কাতলার আঁশের দিকে চৌদ্দ পুরুষ পর আজই প্রথম নজর পড়লো। ভাবতে অবাক লাগে কি পরম যত্নে দক্ষ কারিগরের মতোন একটার পর একটা আঁশ, কে যেন সুনিপুণ দক্ষতায় সাজিয়ে দিয়েছে। কি দরকার ছিল এত কষ্টের? দরকার ছিল নিশ্চয়। না হলে এক এক রকমের মাছের এক এক রকমের আঁশই বা হবে কেন? কিন্তু সে আঁশ যেমনই হোক তার পিছনে কোন একজনের বিশেষ যত্ন নিশ্চয়ই আছে। সেটা মানতেই হবে। মাছ তো আর নিজের গায়ে নিজে আঁশ সাজিয়ে রাখে নি। আত্মরক্ষায় হোক বা জীবন ধারণের জন্যেই হোক। তার হয়ে অন্য কেউই কি এই গুরুত্বপূর্ণই শুধ নয়, গভীর নান্দনিক কাজটি করে দেয় নি? তিনি যেই হন। তাঁর প্রজ্ঞা ও শিল্পী সত্তার তুলনা হয় না। কোনদিন যদি ভালো করে মাছের দিকেই খেয়াল করতাম, তাহলে এমন অপরূপ শিল্পসৃষ্টি দেখে অবাক হয়ে যেতে হতো। কিন্তু খিদের চোটে খেয়েই গিয়েছি। মাছের দিকে তাকিয়ে দেখার সময় পাই নি। অনেকেই হয়তো একে আঁশটে দর্শন বলতে পারেন। ক্ষতি কি!

বিশ্বজুরে এই যে এক খাদ্যশৃঙ্খল, কে যে কখন কাকে খাদ্যে পরিণত করে ফেলবে আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। খিদের দাবি এমনই অমোঘ যে তখন আর সৃষ্টির নন্দনতত্ব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় থাকে না। প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলতে পারেন, সৃষ্টির নন্দনতত্ব নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে আর জীবন ধারণ করতে হবে না। কিন্তু সামান্য মাছের আঁশের ভিতরেও যে অদৃশ্য কারুর পরম যত্নের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে, সে কথা এতদিন কেন খেয়াল হয় নি! প্রতিটি আঁশের এমন নান্দনিক বিন্যাসের ভিতর শুধুই কি বিশেষ নিগুঢ় কোন উদ্দেশ্য রয়েছে? সেকথা হয়তো মৎস বিজ্ঞানী বা জীব বিজ্ঞানীরাই বলতে পারবেন। কিন্ত এত যত্নের ভিতর মনে হয় না কি, এক পরম ভালোবাসাজাত অপরিমেয় আনন্দ লুকিয়ে আছে? যিনি এই মাছের অস্তিত্বের পিছনে রয়েছেন, তিনি যেই হোন না কেন, তিনি সত্যই একজন প্রেমিক। প্রেমিক না হলে বড়ো শিল্পী হওয়া যায় না।

ধার্মিকরা বলবেন। এই তো বাছা। এইবার পথে এসো। এতদিন তো সেকু মাকু সেজে কত কথাই কপচিয়েছো! আমাদের ঈশ্বর না কি ভাঁওতা। বংশ পরম্পরায় শোষণ চালিয়ে যাওয়ার ঢাল মাত্র। না। ধার্মিকদের কথা ধরছি না। তাঁরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে সম্প্রদায়ে এবং দলে ভিভক্ত। ধার্মিকদের কাজ ধর্ম নিয়ে নয়। হলে এত সম্প্রদায়, এত গোষ্ঠী, এত দল উপদলের কোন প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু এইগুলির গুরুত্ব তাঁদের কাছে এতই বেশি যে, ধর্মের কোন প্রয়োজন ধার্মিকদের কোন কালেই ছিল না। আজও নাই। তাদের কথা থাক। তাদের প্রয়োজন ধর্ম নয়। তাদের প্রয়োজন মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদ্বার। তাদের প্রয়োজন গীতা বাইবেল কোরান গ্রন্থসাহেব। তাদের প্রয়োজন সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, দল উপদল। আমাদের প্রয়োজন এইগুলির কোনটিই নয়। আমাদের প্রয়োজন ধর্ম। ধর্ম কি? না, ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ। তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’। -এই যে বিস্ময়ে গানের জেগে ওঠা, এটিই মানুষের ধর্ম। মানবধর্ম।

রুই মাছের আঁশ ছাড়াতে গিয়ে আজ যে হঠাৎ ধর্মের হদিশ পেয়ে গিয়েছি, বিষয়টি এমন নয়। যে বিপুল বিস্ময়ে মানুষের চেতনায় জীবনের গান জেগে ওঠে, তার জন্য তপস্যা লাগে। সাধনা লাগে। আমাদের সে সময় নাই। ইচ্ছেও নাই। তাই আমরা ধার্মিক আর অধার্মিকদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতের থাকতেই বেশি সচ্ছন্দ। অন্তত বংশ পরম্পরায় সেটিই আমাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। এই যে একটি ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকার, এইটিই আবার আমাদের আঁশ। অনেক যত্নে সমাজ রাজনীতি ও ধর্মের ককটেলে এই আঁশের সৃষ্টি। না, মাছের আঁশের মতো সহজ সুন্দর স্বাভাবিক নানন্দিক নয়। বংশপরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে এই আঁশের মহাকাব্য রচিত হয়ে চলেছে। এই আঁশেই কেউ কাউকে মাকু দেখে, সেকু দেখে, চাড্ডি দেখে। কেউ কাউকে আর মানুষ দেখতে পায় না। এই আঁশের আবার শক্তিও কম নয়। সুযোগ বুঝে সুবিধে বুঝে সহজেই রং বদলিয়ে ফেলা যায়। কত সেকু আঁশ মাকু হয়ে গেল। কত মাকু আঁশ চাড্ডি হয়ে গেল তার ইয়াত্তা নাই। বাতাসের জল মাপতে মাপতে এদের দিন যায়। আমরা প্রত্যেকেই ঠিক এই রকম আঁশের অধিকারী। সেই আঁশই আমাদের গতিবিধি কথাবার্তা ওঠবোস নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেই আঁশের ভিতর দিয়েই যখন দেখি ভুবনখানি, তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি।

তাই তখন ঠিকঠাক সময় মতো আমরা জেনে গেলাম কি করে পোশাক দেখে মানুষ চিনে নিতে হয়। কি করে বিকেল পাঁচটায় পাঁচ মিনিট ধরে থালা বাজিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে হাততালি দিয়ে একদেশ একপ্রাণ গড়ে তুলতে হয়। কি করে রাত নয়টায় নয় মিনিট ধরে আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে পটকা ফাটিয়ে করোনা মোকাবিলা করতে হয়। কি করে কোটি কোটি টাকার পুষ্পবৃষ্টি দেখাতে দেখাতে কোটি কোটি পায়ের হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটার ছবিগুলি টিভির পর্দা থেকে সরিয়ে দিতে হয়। কি করে প্রচার করতে হয় ২৪শে মার্চের লকডাউন উপেক্ষা করে ১৩ই মার্চের নিজামুদ্দিনের জমায়েতের খবর। কি করে দুইজন সাধু ও তাদের গাড়ির ড্রাইভারদের পিটিয়ে হত্যার লাইভ ছবি দেখে বিশ্বাস করে নিতে হয় সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের হাতে আর নিরাপদ নয়। এবং পালঘাটের সেই সাধুদের হত্যার অভিযোগে ধৃত শতাধিক অপরাধীদের ভিতর একজনও নামাজী না থাকার খবরটা কি করে চোখ বুঁজে এড়িয়ে যেতে হয়। আমরা যে যেমন যখন যেমন আঁশের ভিতরে নিজেদের মুড়ে রাখি, তখন তেমন সেই আঁশের ণত্ব ষত্বই আমাদের ধর্ম হয়ে যায়। আমাদের চোখের দেখা, কানের শোনা। আমাদের মুখের বুলি। আমদের বিশ্বাসের ভিত ঠিক সেই আ্ঁশের মতোই পাল্টিয়ে যেতে থাকে। শুধু আমাদদের মতো সাধারণ জনগণই বা কেন। সান্ধ্য টিভির পর্দা আলো কারে বসে থাকা সেই সব অসাধারণ ব্যক্তিদের তো আমরা প্রায়ই এমন আঁশ পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে চলতে দেখি। যেসময়ে যে আঁশের খোলস পড়াই লাভজনক। সেই সময়ে সেই আঁশেই নিজেকে শোভিত করে নিয়ে এসে আমাদের প্রতিদিনের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেন এঁরা। গরুর দুধে সোনা’র মতো। সম্পূর্ণ ফ্রী অফ কস্ট! এঁদের যাবতীয় গলাবাজির কষ্ট সে’তো আমাদেরই জন্য! সত্যই দেশসেবার লগ্নেই জন্ম এনাদের। গোত্র যতই আঁশটে হোক না কেন। কারণ আমরা কেউই তো আর ধোয়া তুলসী পাতা নই।

২০শে জ্যৈষ্ঠ’ ১৪২৭

অব্যয়কথা

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s