কবিতা খুঁজতে যেও নাকো আর

জার্মান দার্শনিক নীৎশে মনের ঘোরে টর্চ জ্বেলে মানুষ খুঁজতেন বলে শোনা যায়। শোনা যায় বিদ্যাসাগরের ঠাকুর্দা সময় সংক্ষেপ করার জন্য কোন একদিন গ্রামে ফেরার পথ এড়িয়ে মাঠের ভিতর দিয়ে শর্টকাটে হাঁটছিলেন। সে সময় কোন একজন গ্রামবাসী তাঁকে দেখতে পেয়ে মাঠে বিষ্ঠা ভরা বলে তাঁকে সাবধান করতে তিনি নাকি বলেছিলেন, বিষ্ঠা থাকবে কি করে? গ্রামে মানুষ আছে নাকি? মাঠে বিষ্ঠা ভরা বলে তাঁকে সাবধান করতে তিনি নাকি বলেছিলেন, বিষ্ঠা থাকবে কি করে? গ্রামে মানুষ আছে নাকি? এই দুই লোককাহিনীর সাথে কবি জীবনানন্দ দাশের অমোঘ উক্তির কথাও মনে পড়ে যায়। সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি। না কবি খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্টের কথা ভাবি না। এটা ঠিক কবি সাহিত্যিকদের যুগও নয়। এটা আত্মপ্রকাশের যুগ। এটা আত্মপ্রচারের যুগ। এবং এটা গাঁটের কড়ি খরচ করে ছাপিয়ে বিলানোর যুগও বটে। আপনার সেই সামর্থ্য না থাকলেও কোন অসুবিধা নাই। সারাদিন কবিতা পোস্ট করতে থাকুন। নাম ধরে ধরে ফ্রেণ্ডলিস্ট থেকে এক একজন করে ট্যাগ করতে থাকুন। অর্থাৎ আপনাকে আত্মপ্রকাশ করতেই হবে যেভাবেই হোক। না, শুধু আত্বপ্রকাশ করেই বা কি হবে? আত্মপ্রচার না করতে পারলে, লাইক কমেন্ট কিছুই জুটবে না। ফলে এমন কিছুও করতে হবে, যাতে সেটি জোটে ভালো মতন। আর সেটি করতে গেলে আত্মপ্রচার ছাড়া বিকল্প কোন পথ নাই। না, আপনার কবিতা ভালো কি মন্দ, সেটি কোন বড়ো কথা নয়। আপনার লেখাটি পাঁচালি হল না’কি কবিতাই হলো, সেটাও ধর্তব্যের কোন বিষয় নয়। আপনার পাব্লিক রিলেশনস কতটা জোরাদার, বিচার্য্য বিষয় সেইটিই। তার উপরেই নির্ভর করবে আপনার কবিতা কয়টি লাইক কয়েটি কমেন্ট বাগাতে পারবে। তার উপরেই নির্ভর করবে আপনি ফেল কড়ি মাখো তেল মেনে নিজের পরিশ্রমের পয়সা জলে ঢেলে স্বরচিত কাব্যসংকলন প্রকাশ করতে এগোবেন কিনা। এখন আত্মপ্রচারের এই যুগে, আপনি ঠিক কিভাবে কোন পথে এগোবেন, সেটি আপনার বুদ্ধিমত্তা ও অভিজ্ঞতার বিষয়। কতবার কতো ভাবে হোঁচট খেয়ে উঠে দাঁড়াতে পেরেছেন, তার উপর নির্ভর করবে। এরপরই সাহিত্যসমাজে এবং ভার্চ্যুয়াল জগতে আপনার কিছু খ্যাতি লাভ পাওনা হবে।

না, কবিখ্যাতি কার তৈরী হলো কি হলো না, কিংবা কিভাবে কোন পথে হলো, সেই বিষয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই। বস্তুত এইসময়ের ক্যানভাসে আমাদের কাছে যখন অনুসরণ করার কিংবা প্রভাবিত হওয়ার মতো বিখ্যাত কোন কবিই নাই; তখন নীৎশের মতো টর্চ জ্বেলে মানুষের জায়গায় কবি খুঁজতে গেলেও অনর্থক সময় ও অধ্যবসায় দুই নষ্ট। কিন্তু একটি দুটি চেতনা নাড়িয়ে দেওয়ার মতোন কবিতাও কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব এই সময়ের গড্ডালিকায়? মূল প্রশ্নটি এটিই। অন্তত প্রাথমিক প্রশ্ন এইটিই। আজকের বাংলা সাহিত্যের বাজারে প্রতিদিন যে পরিমাণে কাব্য সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে কিংবা এই নেটদুনিয়ার ভার্চ্যুয়াল জগতে যত বেশি কবিতার সুনামি আছড়ে পড়ছে, তাতে তো ভুরি ভুরি চেতনায় প্লাবন আনার মতো কবিতা দেখা যাওয়ার কথা। চোখের সামনে। কোনটা বাদ দিয়ে কোনটাকে নিয়ে আলেচনা করবো। এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা কি তাই? হলে তো কোন চিন্তাই ছিল না অবশ্য। শিক্ষিত সংস্কৃতিবান সমাজ পরিসরে নতুন নতুন ভাবনাক্রমের দিগন্ত খুলে যাওয়ার কথা তাহলে। এবং যে দিগন্ত তার আত্মশক্তির বলে বলিয়ান হয়ে সমাজের বৃহত্তর অংশকেও নতুন নতুন চেতনার উজ্জ্বল আলোতে উদ্বিপ্ত করতে পারতো সহজেই। অন্তত সেখানেই সৎ সাহিত্যের মূল্য। নোঙর। এবং সার্থকতা। এই বাংলায় ঊনবিংশ শতকব্যাপী এবং বিংশ শতকের মধ্য পর্যায় অব্দি সময়সীমায় ঠিক যে ঘটনাটি ঘটেছিল বলেই, সম্পূর্ণ স্থবির বঙ্গসমাজ নানাভাবে নানান দিক দিয়ে আর কিছু না হোক বেশ একটু নড়েচড়ে উঠেছিল।

অত্যন্ত দুঃখ লাগে যখন দেখা যায়, সেখান থেকে আজকের সাহিত্য সাধনা প্রায় এক অচলায়তনের আবর্তে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে আত্মপ্রচারের দুঃসহ এক স্থবিরতায়। এই সাহিত্য সাধনা কোনদিক থেকেই সমাজকে পুষ্টি জোগাতে পারছে না। পারছে না তার কারণ, সাহিত্য সাধনা যখন সাহিত্যকে বাদ দিয়ে সাহিত্যিকের খ্যাতি ও প্রতিপত্তির অভিমুখেই একান্ত মনযোগী হয়, তখন এমনটা হওয়াই স্বাভাববিক অন্তত। কিন্তু এমনটা ঘটছে কেন? কেন আজকের কবিতা আমাদের চেতনাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে আমাদের অভ্যস্ত বিশ্বাস নিশ্চিন্ত ভরসা এবং একান্ত আত্মসুখকে টালমাটাল করে দিতে পারছে না? পারছে না, তার মূল কারণ আমরা জীবন থেকে সরে এসেছি। আমরা আমাদের অস্তিত্বের শিকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে নিরালম্ব এক আত্ম প্রতিকৃতির জগত গড়ে তুলেছি। যেখানে সবকিছুরই মূল অভিমুখ আত্মপ্রকাশ আত্মপ্রচার ও আত্মসুখ জনিত পরিতৃপ্তি। বস্তুত এই যুগে আমরা কিন্তু আসলেই বড়ো অল্পেতে সন্তুষ্ট। অমুক কবি দশটি পুরস্কার পেয়ে গিয়েছেন, তবে তো আর কথাই নাই। ওনার বই কিনে বইমেলা থেকে ওনার বইতেই অটোগ্রাফ আদায় করে নিতে হবে। হাসিমুখে ওনার সাথে একটি সেল্ফি তুলে নিলে তো চাঁদে নামা নীল আর্মস্টং হয়ে গেলাম। ওয়ালে একবার পোস্টেই কেল্লাফতে! না সেই বইয়ের ভিতর ডুব দিয়ে আদৌ কোন মণিমুক্ত আছে কিনা, দেখার দরকার কি? পুরস্কৃত কবি যখন ভালেই লিখবেন। সাহিত্যের হাটে খ্যাতি বিকোচ্ছে যখন, তখন তার সব লাইনই মহাকাব্য নিশ্চয়! এবং আমাদের কবিতাপাঠও সেই মতোই তৃপ্তি খুঁজে নেবে। কোন চিন্তা নাই। আমরা ভাবতেও যাবো না। দেখতেও যাবো না। আমদের অভ্যস্থ চেতনায় আদৌ কোন প্লাবন নামলো কিনা। আসলে আমাদের অসাড় চেতনা এতটাই অসার হয়ে পড়ে রয়েছে যে, আমরা কবিতার ভিতরে সত্যি সেরকম কিছুই খুঁজে দেখতে আজ আর অভ্যস্ত নই। এটাই সেই অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়া। যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

কবিতার পাঠকেরই যখন এই অবস্থা, তখন অচিরেই বাংলার সাহিত্য যে কোমায় চলে যাবে না, সেকথা বলা যায় না সহজে। এইসময়ের কবিই কি খুঁজছেন এমন কোন সত্য, যার জন্য নিজের অস্তিত্বের ভিতরে উথাল পাতাল চলছে তাঁর? না। সত্যিই সেইরকম ভাবে নতুন কোন সত্যে পৌঁছাবার কোন তাগিদই তাঁর নাই। তাই খুঁজবেনই বা কি করে? কেননা তাঁর লক্ষ্য তো স্থির। কবিতাই তাঁর কাছে সেই ক্যাপিটাল। মূলধন। যার সঠিক বিনিয়োগ তাঁকে তাঁর কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে দেবে। কবিখ্যাতি। কবিখ্যাতির মতো এমন স্বল্প অর্জনেই তিনি সন্তুষ্ট। এটাই এই সময়ের অন্যতম অসুখ। একজন কবি কেন কবিতা লিখবেন? আত্মপ্রকাশের জন্য? আত্মপ্রচারের জন্য? আত্মতৃপ্তির জন্যে? সমাজে কবিখ্যাতি মিললেই পূরণ হয়ে যাবে এই সবকয়টিই। এইগুলি আসলেই সাহিত্যের দিগন্তে এমনই ঠুনকো, এমনই মূল্যহীন যে, কদিন বাদেই হওয়ায় মিলিয়ে যাবে। এমনভাবেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে যে কবির সন্তান সন্ততিদেরকে কবির ছবি বুকে ধারণ করে কবিকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে হবে। না একজন প্রকৃত কবি এইগুলির কোনটিরই জন্য কোনদিন কবিতা লেখেন না। তিনি কবিতা লেখেন তাঁর জীবন অন্বেষণ থেকে। তাঁর সময়কে তাঁর অভিজ্ঞতায় ধারণ করে শাশ্বত জীবনসত্যকে নতুন যুগের উপযুক্ত করে খুঁজে পেতে। প্রকাশ করতে। তুলে ধরতেই কলমে কবিতা ধরতে এগোতে থাকেন একজন সৎ কবি। প্রকৃত কবি। পরিপার্শ্বের সমাজ বাস্তবতার অসুস্থতাগুলি যতক্ষণ না একজন কবিকে তাঁর অস্তিত্বের ভিত থেকে পীড়িত করতে শুরু করে, ততক্ষণ সেই কবি নতুন কোন সত্যকে খুঁজতে এগোবেনই বা কি করে? কেনই বা এগোবেন? আজকের আত্মসুখ সর্বস্ব আত্মগরিমার যুগে দেশ দশ সমাজ মানুষকে নিয়ে ভাবার মতো সময় কবিতার লেখক ও পাঠক কারুরই নাই। সকলেই নিজের চরকায় তেল দিতে ব্যস্ত। এইসময়ের কবিতাও সেই নিজের চরকায় তেল দেওয়ারই অন্যতম একটি মাধ্যম।

এই যে নিজের চরকায় তেল দেওয়ার মানসিকতা। এটাই একজন কবিকে পঙ্গু করে বিকলাঙ্গ করে রাখার পক্ষে যথেষ্ট। সেই পঙ্গু ও বিকালঙ্গ মানসিকতা থেকেই একজন পাঠকও তাই কোন কবিতা খুঁজতে এগোন না আর কোনদিন। সাহিত্যবাজারের ঠেকে গিয়ে পছন্দের কবি পছন্দ করে নেন সময়ের ট্রেণ্ড অনুসারে। এই সাধারণ কিন্তু অমোঘ অক্ষের চারদিকে ঘুরপাক কাচ্ছে আজকের সাহিত্য। আজকের কবিতা। কবি ও তার পাঠক উভয়েই। স্বদেশ স্বজন মানুষ মনুষ্যত্ব আদর্শ বিবেক সত্য ও সভ্যতা এইগুলির কোনটাই আজ আর আমাদের চেতনায় বিশেষ কোন আলোকপাত করে না। করে না কারণ ভোগবাদের হাত ধরে বিশ্ব ধনতন্ত্রের পায়ে আমরা মাথা মুড়িয়ে বসে রয়েছি। তাই আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তাই নিজের বাইরে বাকি জগৎটাকে আমরা ধরেই নিয়েছি, আমার থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ নয়। আত্মসুখ আত্মশ্লাঘা আত্মপ্রকাশের জন্য আত্মপ্রচারই আমাদের সকলের থেকে বড়ো আয়ুধ। সেই আয়ুধকে নিরন্তর ধারালো করে তোলার বিষয়েই আমাদের অন্যতম প্রধান সাধনা। আমরা এক একজন সেই সাধনায় বিশেষ ভাবে সিদ্ধিলাভ করেছি। করে চলেছি। করতে চাইছি। ফলে কবিতা খুঁজতে যাই না আমরা। সেই সময় ও তাগিদ আমাদের নাই। থাকলেও লাভ হতো না। পস্তাতেই হতো। বহু যুগ আগেই হয়তো শেষ কবিতা লেখা হয়ে গিয়েছে। হাজার খুঁজলেও কবিতা আর খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। যে কবিতা আমাদের চেতনাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে অভ্যস্ত জীবনদর্শনের অসারতা বেআব্রু করে দিতে পারবে।  কবির কথা মতো প্রতিদিন যা জমিয়ে তুলছি, সে শুধুই শব্দের কঙ্কাল। কবি বহুদিন আগেই আমাদের সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা কর্ণপাত করি নি। করি নি, কারণ আমরা কবি ও কবিতার সাধক নই। আমাদের সাধনা কবিখ্যাতি ও আত্মপ্রচারের অভিমুখে বিস্তৃত।

১৩ই জ্যৈষ্ঠ’ ১৪২৭ অব্যয়কথা

 

 

 

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s