২৪ ঘন্টার একুশ বছরে ২৪ ঘন্টা!

আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারী। আমাদেরই মতোন। হুজুগ সর্বস্ব। তারপর আবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলে কথা। তাই একটু ধুমধাম না করলে খারাপ দেখায়। সম্বচ্ছর এই একটি দিন, আমাদের মাতৃভাষার জন্য দরদ উথলে ওঠে। সেটি বাংলাভাষার জন্য যত নয়, তত বেশি দিনটির আন্তর্জাতিকতার জন্য। অ আ ক খ উপলক্ষ্য মাত্র। তাই দিনটিও শেষ, আমরা আবার ব্যাক টু দ্য প্যেভেলিয়ন। পেটে বাচ্চা এসেছে। খোঁজ খৌঁজ কোন ইংলিশ মিডিয়ামে কত খরচ! বাচ্চা বসতে শিখেছে? বলতো সোনা হোয়্যার ইজ ইউর নোজ! না তাতে বাঙালির নাক কাটা যায় না। কোনদিনও যায় নি। আর যাবেও না। আর শুধু ইংরেজিই বা কেন, সঙ্গে দোসর হিন্দীর কদরও কম নয় আর। সন্তান স্কুলে যাচ্ছে? গড়গড় করে হিন্দী ইংরেজি বললে তো গর্বে বাপ মায়ের মাটিতে পা ঠেকাই দায়! বাড়িতে লেখাপড়ার চল নাই? তাতে কি? বাপ মা কল কারখানায়র মজুর তো? তাতেই হবে। সন্তান গড়গড় করে হিন্দীতে রপ্ত হয়ে যাবে হাফপ্যান্ট পড়া বয়সেই। সে গলাগলি থেকে গালাগালি যাই হোক না কেন। না বাঙালির কোন হেলদোল নাই। একজন বাঙালিও যদি খুঁজে পাওয়া যায়, বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলে, ওরে বাব্বা! সমাজে আঁতেল বলে পরিচিত হয়ে যেতে দুই মিনিটও লাগবে না। বাংলা বানান ভুল হলে আমাদের কারুর লজ্জায় মাথা কাটা যায় না। কিন্তু দুধের শিশু সি এ টি ক্যাট ঠিক মতো মনে রাখতে না পারলেই বাপ মায়ের বুকে ঠক ঠক কাঁপন শুরু হয়ে যায়। দুপাতা বাংলা লেখা পড়তে গেলেও বাঙালির ইংরেজি হিন্দী জ্ঞানের আঁচ পেতে হবেই হবে। বাঙালির দোকানে ঢুকলে বিশুদ্ধ বাংলা বললেই মুশকিল। দোকানদার নির্ঘাৎ গেঁয়ভুত ধরে নিয়ে রাম ঠকান ঠকিয়ে দেবে। ফলে, না বাংলা নৈব নৈবচ। লেখাপড়ায় নয়। মেলামেশায় নয়। কোন পেশায় নয়। ধান্দাবাজিতেও নয়। হ্যাঁ শুধু গল্প কবিতা লেখাতে বাংলা চলতে পারে। তবে পড়ার মতো বাংলা জানা পাঠক থাকলেও বাংলায় পড়ে সময় নষ্ট করার মতো বাঙালি আছে কি না সন্দেহ। কিংবা আজকেও থাকলে, কালকেও থাকবে কি? ধান্দাবাজ জ্যোতিষীরাও জোর দিয়ে বলতে পারবে না।

তবে কোনরকম জ্যোতিষচর্চা না করেও একথা বলা যায়, সেদিন খুব বেশিদিন দূরে নয়, যেদিন এই বাংলার বাঙালিরাই রাজ্যে লেখাপড়ায় হিন্দীভাষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবিতে রাজপথে ধর্নায় বসে পড়বে। তাতে বাংলার ভাগ্য পথে বসে পড়লেও বাঙালির কিছু যাবে আসবে না। বাঙালি জানে, কখন কোন যুগে কোন ভাষায় অর্থাগম প্রশস্ত হয়। কোন ভাষা তাঁকে প্রাদেশিকতার লজ্জা থেকে মুক্তি দিতে পারে। বাঙালি তখন সেই ভাষার দাসত্ব করতেও পিছপা হবে না। ইতিহাসের কোন কালেই হয় নি। এখানেই বাঙালির ভাষাপ্রেমের নোঙর।

এই বাংলায় ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভুমিকা তাই নিতান্তই আনুষ্ঠানিক। গুলি মারো বাংলা ভাষার। সকলের লক্ষ্য একটিই। ইংরেজি কিংবা নিদেন পক্ষে হিন্দীর গোলামি করে দুই পয়সা বেশি কামিয়ে নেওয়ার। বাঙালির এই গোলামি প্রবৃত্তিই তার মাতৃভাষার প্রতি সীমাহীন ঔদাসীন্যের মূল কারণ। বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের ভিতেই এই গোলামি প্রবৃত্তি দৃঢ় ভাবে মজবুত ছিল। আর স্বাধীন ভারতে প্রাদেশিকতার লজ্জা থেকে মুক্তির দুর্নিবার আকাঙ্খা বাসনা ও তাগিদ বাঙালিকে আজকের অবস্থানে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। তাই নিজ মাতৃভাষা নিয়ে সে সদা শঙ্কিত ও লজ্জিত। পাছে তাকে কেউ বাঙালি বলে দেগে দেয়। বুক ঠুকে কোন বাঙালিকে তার বাঙালিত্বের আত্মপরিচয় দিতে দেখা যায় কখনো? সে হয় ভারতীয় পরিচয়ে গৌরবান্বিত। নয়তো হিন্দু কিংবা মুসলিম পরিচয়ে তার যাবতীয় শ্লাঘা।

এর ভিতর দিয়েই বাঙালির মাতৃভাষা প্রেমের প্রকৃত চিত্রটি বেআব্রু হয়ে পড়ে। না না, তাতে আর লজ্জা কি? আমাদের না আন্তর্জাতিক মানে শিক্ষিত হতে হবে? নিদেন পক্ষে সারা ভারতের কাছে মুখ দেখাতে হবে। তাই ইংরেজি কিংবা হিন্দীতে সড়গড় না হলে আমাদের দশা কি হবে? না হতে পারবো শিক্ষিত। না হতে পারবো ভারতীয়। না জুটবে ভালো চাকুরী। না সফল হতে পারবো অর্থকরী কোন পেশায়। তাই বাংলা পড়তে বলো না। বাংলা বলতে বলো না। বাংলা লিখতে হাত কাঁপুক। তাতে হাতেরও লজ্জা নাই। হাতের মালিকেরও লজ্জা হবে না। বরং বাংলা লিখতে শিক্ষার কলকব্জা ভেঙে গেলেও ক্ষতি নাই। তাতে অশিক্ষিত প্রমাণ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। বাঙালি হিন্দীতে ইংরেজিতে যত চোস্ত হয়ে উঠবে, ততই সে সমাজে কেতাদুরস্ত তালেবর বলে পরিচিত হতে পারবে।

তাই সকলকেই বলতে শুনি। না, বাংলার সাথে হিন্দী কিংবা ইংরেজির তো কোন বিরোধ নাই। একাধিক ভাষা শেখা তো ভালোই। বিশেষ করে ভারতে থাকলে এই দুটি ভাষা ছাড়া গতিও তো নাই। ফলে বাঙালিকে হিন্দী ও ইংরেজিতে রপ্ত হতেই হবে। বাংলাটা না শিখলেও ক্ষতি নাই। কিংবা, বাংলা তো মাতৃভাষা। ওটা আবার আলাদা করে শিখতে হয় নাকি? যেন কোন আজব কথা শুনে অবাক হলেন তিনি। এদিকে হিন্দীভাষীরা হিন্দীর প্রসার ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য দেশব্যাপি হিন্দী শিক্ষার উপর লাগাতার জোর দিয়ে চলেছে। এবং সেই লক্ষ্যকেই পাখির চোখ করে নানাবিধ সরকারী বেসরকারী কার্যক্রম ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু আ মরি বাংলা ভাষা? তার বরাদ্দে কি জুটেছে? না খোদ বাঙালিরই অবজ্ঞা অবহেলা অকৃতজ্ঞতা। লাঞ্ছনা উপেক্ষা আর বিতৃষ্ণা।

বুকের ভিতর সেই বিতৃষ্ণা বহন করেই বাঙালির একুশ উদযাপন। তাই ঘড়ির কাঁটা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ছুঁয়ে ফেললেই কেল্লাফতে। আর বাংলাভাষার ভার বহন করতে হবে না ভারবাহী গাধার মতোন। বইমেলায় যাওয়া আর সেল্ফি তোলার ভিতর বাংলাভাষার স্থান খুব একটা নাই। শুধুমাত্র বাংলা বইমেলা তো আর নয়। ফলে সেই একুশের বাংলা ভাষার ভার কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বাঙালি আজ সত্যিই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। আবার পরের বছর দেখা যাবে। আর রাষ্ট্রপুঞ্জের বদান্যতায়, একুশ কিন্তু বাংলাভাষা দিবস নয়। মাতৃভাষা দিবস। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারীতে বাংলা নিয়ে মাতামাতি করারও বেশি কিছু নাই। মনে রাখতে হবে সেটাই। বরং অন্যদের মাতৃভাষার প্রতি সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের ভাষাকেও যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে বই কি। ফলে এই বাংলায় বাঙালির একুশ মানেই বাংলা নয়। হিন্দী ও ইংরেজিও বটে। অনেক আঁতেলকেই সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা মনে রাখতে দেখা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে সেটিই যা লজ্জার বিষয়। আশার কথা, এই আঁতেলরাই সংখ্যালঘু। সারাদিন হিন্দী ইংরাজি সামলিয়ে অবসরে বাংলা কবিতা লিখেই মাতৃভাষার সদগতি করা পাবলিক মাত্র। না তাদের নিয়েও বিশেষ চিন্তার নাই। তাদের বাংলা প্রীতি ভাষার জন্য যতটা নয়, আত্মপ্রচারের জন্য ততটাই। এবং তারা সংখ্যলঘুও বটে। বাকিরা হিন্দী ইংরাজি নিয়ে মহাসুখে ধুমধাম করে সহবাস করতেই অভ্যস্ত ও বদ্ধপরিকর। এটাই আধুনিক বাঙালির মুখ। সে মুখ যতই একুশে ফেব্রুয়ারীর মুখোশে ঢাকতে চাক না কেউ। সে মুখোশের আয়ু বছরে ২৪ ঘন্টার বেশি তো নয়।

অব্যয়কথা

২২শে ফেব্রুয়ারী ২০২০

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s