ভেন্টিলেশনে বাংলা সাহিত্য

বাংলার সাহিত্য জগতে এখন একদিকে মেধাহীন পুঁজি নির্ভর ব্যবসায়িক পত্রপত্রিকার রমরমা, অন্যদিকে মধ্যমেধার সাহিত্যিকদের দৌরাত্ম্য। এর ভিতরেই ইনটারনেটের কল্কে ধরে সাহিত্যের সাথে সম্বন্ধহীন কবি যশপ্রার্থীদের বিশাল মিছিল। আর এর মুখোমুখি পাঠাভ্যাস বর্জিত বাঙালি পাঠক। মধ্যেখান থেকে ভালোর মধ্যে সমাজ জীবনের অন্যান্য সকল দিকে পরাজিত হয়েও বাংলা স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণদের এই সাহিত্য জগতে যেটুকু মুখরক্ষা হয়। অপরদিকে বিস্তর বাংলা অক্ষর নিয়ে টানাটানি হলেও জীবন থেকে নেওয়া বাক্যেরা আজও সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে থাকে। সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠে অক্ষরসেবী মঞ্চ কাঁপানো খ্যাতিমানেরা। খবরের হেডলাইনের বাইরে যাঁদের লেখালেখির সাহিত্যমূল্য নেই বললেও সত্যের অপলাপ হওয়ার সম্ভাবনা কম। আসল কথা পুঁজি নির্ভর বাজারের নিয়ন্ত্রণে বাংলা সাহিত্য এখন ভেন্টিলেশনে।  

আর এর ভিতরেই সাহিত্যের হাটে মুখ দেখাতে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে। আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের মতো হাতে হাতে ইনটারনেট পৌঁছিয়ে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভরাডুবির ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে বলা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ফেল কড়ি ছাপাও বই। ফলে চারিদিকে নিজের নামে বই ছাপানোর ধুম। লেখকের অর্থে বই ছাপিয়ে অর্থ রোজগারের একটা নতুন রাস্তাও খুলে গিয়েছে এক শ্রেণীর প্রকাশকদের। হল ভাড়া করে বইপ্রকাশের সেল্ফি রাতারাতি নেট সেলিব্রেটি বানিয়ে তোলার বিষয়ে বিশেষ ফলদায়ক। ফলে বাংলা সাহিত্যবাজার আজ কোলাহল মুখর। এই কোলাহলে লেখক প্রকাশকের ভিড় যত বেশি, পাঠকের ভিড় ততটাই কম। তার কারণ এই নয় যে বাংলা সাহিত্যের পাঠকের ভুষিমালে এলার্জী রয়েছে। বরং ঠিক উল্টো। আজকের পাঠকের এলার্জী প্রকৃত সাহিত্য বেছে নেওয়ার বিষয়েই। অত সময় কই। আর কিই বা হবে প্রকৃত সাহিত্য নিয়ে টানাটানি করে? বাংলা সাহিত্যের পাঠকের নজর বরং সাহিত্য বাজারে একটা বই প্রসবের দিকেই। অর্থ কোন বড়ো প্রতিবন্ধক নয়। অর্থাৎ লেখক ও প্রকাশকের বাইরে যে পাঠকের জগৎ থাকার কথা, সেই জগতটাই আজ ক্রমবিলুপ্তির পথে। কালকের পাঠক আজকের লেখক কিংবা প্রকাশকের বেশ ধারণে তৎপর হয়ে উঠেছে। কারণ এই দুটি পথেই সহজ জনপ্রিয়তা লাভের উপায় বর্তমান। বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে ভিড় জোগার করতে পারলেই কেল্লাফতে। কয়টি বই বিক্রী হলো কিংবা কয়জন সেই বই পড়লো, সেটি কোন বড়ো কথা নয়। বড় কথা, হল ভরে উঠলো কিনা। বড়ো কথা জনপ্রিয় সাহিত্যমুখেদের হাতে হাতে প্রকাশিত বইয়ের ছবি নেটে ছড়ানো গেল কিনা। এও এক বাজার। তবে যতটা না বই বিক্রীর বাজার, তার থেকে অনেক বেশি সেল্ফি প্রচারের বাজার। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাই যার আসল লক্ষ্য। এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তী বই প্রকাশ উৎসবের মঞ্চে সাহিত্যিক হিসাবে চেয়ার দখল করতে সাহয্য করবে সন্দেহ নাই। বাংলা সাহিত্যের বাজারে আজকের রথীমহারথীদের পাশে জায়গা করে নিতে হলে এই এক সহজ পথ। সেই লক্ষ্যেই কেউ কবি কেউ প্রকাশক। না বাংলা সাহিত্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। সাহিত্য বাজারে জনপ্রিয়তাই আসল বিষয়।

সাহিত্যের এই বাজারে মেধার কোন প্রাসঙ্গিকতাই আজ আর অবশিষ্ট নাই। মধ্যমেধার লেখকরাই আজকের সমাজের নয়নমণি। মেধাহীন স্তাবকদের হর্ষধ্বনিতেই তাদের আত্মতুষ্টি। এরপর কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের তল্পি বাহকের সম্মান পেলে তো কথাই নাই। মাটিতে পা পড়ার আর উপায় থাকে না। মঞ্চ থেকে হেডলাইন, তাদের রিজার্ভেশন সকলের আগে। তাদের নিয়ন্ত্রণেই বাংলার পাঠক। না বাংলার পাঠক মানেই যে বাংলা সাহিত্যের পাঠক, এমন মনে করার কারণ নাই। ফলে স্তাবক মানেই পাঠক না হলেও, বলা যায় পাঠক মানেই স্তাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক শিবির নির্ভর সাহিত্যিক স্তাবকতার একটি ধারা বর্তমান সময়ে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে। এই ধারায় নাম লেখাতে পাঠক হওয়ার দরকার পড়ে না। আর পাঠক হলেও মেধাহীন স্তাবকতায় অসুবিধেও হয় না রাজনৈতিক শিবিরায়নের সমাজবাস্তবতায়। মধ্যমেধার সাহিত্যিকদের আজ যে রমরমা অবস্থা, তার পেছনে অনেকগুলি কারণের অন্যতম এই রাজনৈতিক শিবিরায়নের সমাজবাস্তবতা। বিগত পঞ্চাশ বছরে ধারাবাহিক ভাবে সমাজে শিক্ষার অবনমন আমাদেরকে আজ এই পর্যায়ে এনে ফেলেছে। সমাজের পরতে পরতে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটে চলেছে নিরন্তর, তার মূলেও রয়েছে শিক্ষার এই ধারাবাহিক অবনমন। আজকের লেখক পাঠক প্রকাশক সকলেই এই এক রোগের শিকার। এবং রোগটা বিশেষ ভাবেই সংক্রমক। নেট বিপ্লবের হাত ধরে এই সংক্রমণ বাংলায় সর্বাত্মক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে আজ।

ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখার সময়ে, বর্তমান যুগটি যদি বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলেই খ্যাত হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। বস্তুত আজকের সাহিত্যে সমাজকে পুষ্টি দেওয়ার মতো কোন রসদ নাই। সমাজকে সঠিক পথ প্রদর্শনের মতো কোন শক্তি নাই। এই সময়ের সাহিত্য সহজ জনপ্রিয়তা লাভের অন্যতম একটি মঞ্চ মাত্র। যেখানে পাঠক লেখক প্রকাশক কেউই সাহিত্যের প্রতি সমাজের প্রতি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ নয়। সমাজ, জীবন ও সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতাই সাহিত্যের জীয়নকাঠি। আজকের বাংলা সাহিত্য সেই দিশা থেকে বিচ্যুত। আজকের বাঙালি সাহিত্যিক সেই পথের পথিক নয় আর। সে দিকভ্রান্ত না সুবিধাবাদী সেকথা সময়ই বলবে। আজকে অন্তত স্বীকার করতেই হবে, বাংলা সাহিত্য এখন ভেন্টিলেশনে।

এ এক অদ্ভুত স্থিতাবস্থা। সাহিত্য সংস্কৃতিতে স্থিতাবস্থা মানেই বিপর্যয়। নতুন কোন ভাবনা নাই। নতুন কোন পথের সন্ধান নাই। নতুন কোন আলোড়ন নাই। সবটাই এক গড্ডালিকা প্রবাহ। আর ভিড় বাসের পাদানীতে পা রাখার মতো সকলেই গুঁতোগুঁতি করছে সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানোর জন্য। এই সময়ের সাহিত্য সেই গড্ডালিকা প্রবাহের সাহিত্য। নাম করা জনপ্রিয় পত্রপত্রিকার পাতায় নজর রাখলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে ওঠে। লেখার মান, লেখার বিষয় বস্তু, লেখার সাহিত্যমূল্য সবই নিম্নমুখী। না, অনেকেই সহমত হবে না অবশ্যই। অনেকেই বা কেন, অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়ে সহমত হবেন না বলাই বাহুল্য। কারণ যে গড্ডালিকা প্রবাহ সাহিত্যজগত সহ সমগ্র সমাজটাকেই গ্রাস করে ফেলেছে, সেখানে কোনটি উৎকৃষ্ট আর কোনটি নিকৃষ্ট সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল মানুষের সংখ্যা খুব বেশি আর অবশিষ্ট নাই। স্থিতাবস্থা কালের এই এক বড়ো প্রমাণ।

দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাদী কৌশলে সস্তার সাহিত্যকে সাহিত্য বাজারে জনপ্রিয় করে যেতে থাকলেই অচিরেই পাঠকের মন মনন মেধাকে বনসাই করে রাখা যায়। আর সেই প্রক্রিয়া কয়েকটি প্রজন্ম ধরে সাফল্যের সাথে রূপায়িত করে যেতে পারলেই কেল্লাফতে। এর সাথে শিক্ষার ক্রম অবনমন যোগ হলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমাদের বাংলায় কাঁটাতারের উভয় পারেই কম বেশি এই ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে। সাফল্যের সাথে ঘটানো হচ্ছে। ফলে এর পেছনে নির্দিষ্ট ছক ক্রিয়াশীল। সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে মানুষের মেধাকে খর্ব করে দিতে পারলেই পুঁজিবাদী ধনতন্ত্রের সাফল্য দী্র্ঘস্থায়ী হয়। এটি একটি চিরন্তন সত্য। আমাদের বাংলায় এই ঘটনা অত্যন্ত ফলদায়ক হয়েছে আজ। এর সাথে প্রযুক্তি বিপ্লবের হাত ধরে সহজে সস্তার জনপ্রিয়তার দিগন্ত খুলে যাওয়ায়, সর্বাত্মক হয়ে উঠেছে সমগ্র প্রক্রিয়াটি। ফলে মানুষ আজ আর কোন প্রশ্ন করতে উৎসাহী নয়। আগ্রহী নয় সুস্পষ্ট কোন প্রশ্নের সমনাসামনি হতে। যাবতীয় গূঢ় প্রশ্নকে এড়িয়ে চলার প্রবণতার ভিতরেই মানুষের আত্মপ্রসাদ লাভ। বরং প্রশ্নহীন ভাবে জীবন উপভোগের অভীপ্সা আজ মানুষকে চালিয়ে নিয়ে চলছে। জগতের মাঝে জীবনের যে প্রকৃত উদ্বোধন, সেখান থেকে বহুদূরবর্তী অবস্থানে মানুষের লোভ লালসা লক্ষ্য ক্রমাগত ভোগবাদী জীবনবোধের অক্ষের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা গোটা সমাজ যখন এইরকম অবস্থানে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বভাবতই তার সাহিত্য সংস্কৃতিও বনসাই হয়ে আটকিয়ে পড়ে। লেখক পাঠক প্রকাশক মেধাহীন আস্ফালনে পরস্পর পিঠচাপড়িয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। রাতের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটে না কোন।

না সকলেই যে দিব্বি নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে পারে তাও না। তাদের বিনিদ্র রজনী উৎকন্ঠিত হয়ে প্রহর গোনে। যারা এখনো নিজের মন মনন মেধাকে এই গড্ডালিকা প্রবাহে বিসর্জন দেয় নি। তাদের ভিতর থেকে নিশ্চয় বাংলা সাহিত্যকে ভেন্টিলেশন থেকে উদ্ধার করার প্রয়াস জারি রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। আজকে হয়ত তাদেরকে খুঁজেতে গেলে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য তাদের একান্ত সাধনা নিশ্চয় বিফলে যাবে না। কিন্তু সফল হওয়ার যুদ্ধ বড়ো কঠিন। একথা বলাই বাহুল্য। কারণ একটিই। প্রতিপক্ষ প্রবল পরাক্রান্ত। তবু, আশার কথা একটিই, মানুষের ইতিহাস মানুষের সাথেই থাকে। মানুষ যদি একটু সচেতন হয়ে উঠতে পারে। তাই এই অসময়ে, মানুষকে সচেতন করার দায় ও দায়িত্ব অনেকের। বিশেষ করে –“যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি, এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা”।

অব্যয়কথা

৫ই ফাল্গুন ১৪২৬

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s