কবিখ্যাতি ও কাব্যচর্চা

না, একথা স্বীকার না করে উপায় নাই, বাংল কাব্যচর্চার দিগন্তে কাব্যের থেকে খ্যাতির চর্চা অনেক বেশি। এবং সেই চর্চার দিগন্তে আজও কবির কাব্যের থেকেও কবির জনপ্রিয়তা অর্থাৎ খ্যাতিই বেশি আলোচিত হয়। তা সে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই হোন বা নজরুল জীবনানন্দ বুদ্ধদেব বসু বিষ্ণু দে সুনীল শক্তি শামসুর আল মাহমুদ কিংবা জয় গোস্বামী। সাহিত্যজগতে একবার কোন কবির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেই তিনি বড়ো কবি। চর্চিত হতে থাকে তাঁর খ্যাতির মহিমা থেকে জীবনবৃত্তান্ত। অনেকটাই আড়ালে পড়ে থাকে তাঁর কাব্যের সামগ্রিক আলোচনার বস্তুনিষ্ঠ পরিসর। একথা অনস্বীকার্য যে, কাব্যচর্চার দিগন্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এখনো অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। পরবর্তীতে নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু সেই আলোচনাও তাঁদের কবিখ্যাতির চর্চার তুলনায় অনেকটাই কম। বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষার সাহিত্যে খ্যাতিমান কবিদের সামগ্রিক কাব্যচর্চা যতটা শক্তিশালী ও সার্বিক, বাংলা সাহিত্যে তা নয় আজও। এর অন্যতম প্রধান কারণ, সাহিত্যসমালোচনা বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক উদাসীনতা। আমরা কবিতার বই নিয়ে যতটা টানাটানি করি, কবির অটোগ্রাফ বা খ্যাতি নিয়ে টানাটানি করি অনেক বেশি। কিন্তু কবির কবিতা নিয়ে আলোচনার সময়, আমাদের সাহিত্যের আগ্রহে কখনো জোয়ার আসে না। এবং আমাদের ধারণায়, কবিতা নিয়ে আলোচনার বিষয়টি প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক ও ছাত্রদের এক্তিয়ার ভুক্ত। সাধারণ পাঠকদের সেবিষয়ে কোন মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। পাঠক কবির কবিতা পড়ে বা আবৃত্তি করে মুগ্ধ হলেই, কাব্যচর্চা সমাপ্ত। কবির কবিতা নিয়ে আলোচনার সময় ও আগ্রহের তাই এত অভাব আমাদের মধ্যে।

আমরা বরং উৎসাহী কবির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। কোন কবি কোন রাজনৈতিক শিবিরের বা কোন কবি কবে কোথায় কি পুরস্কার পেলেন, সেইসব তথ্য নিয়ে আমাদের যাবতীয় আলোচনা। খুব কমই দেখা যায়, আমরা কবির কাব্য নিয়ে গভীর ভাবে ভাবিত। কবির কাব্যে সমকাল ও চিরকালের ভিতর দ্বন্দ্ব ও সমাঞ্জস্য বিধান কিভাবে করলেন কবি, সেই বিষয়ে আমাদের আগ্রহ কম বা প্রায় নাই বললেই চলে। বরং কোন কবির কোন কাব্য অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হলো সেই বিষয়ে আমাদের জানার ব্যগ্রতা অনেক বেশি। এই যে কবিতা ছেড়ে কবিকে ধরে থাকা, এইটি বাঙালি পাঠকের স্বভাবধর্ম বললেও খুব ভুল বলা হয় না। তাই জনপ্রিয় কবিকে ঘিরেই পাঠকের যাবতীয় কোলাহল। জনপ্রিয়তার বাইরে বিশুদ্ধ ও সমৃদ্ধ কবিতার খোঁজে আমাদেরকে সচারচর দেখা যায় না।

এবার দেখা যাক, জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কোন ধরণের কবিতাগুলি বৃহত্তর পাঠকসমাজকে বেশি আকৃষ্ট করে। এইবিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে, আমরা দেখবো, পাঠকসমাজে সেই ধরণের কবিতাই বেশি জনপ্রিয় হয়, প্রধানত যে সব কবিতায় একটি সুস্পষ্ট কাহিনী থাকে। কিংবা থাকে নির্দিষ্ট স্লোগান মুখর প্রত্যয়ই উচ্চারণ। এবং মূলত যে কবিতাগুলি আবৃত্তি যোগ্য নয়তো ছন্দতালে সহজেই মনের ভিতর গেঁথে যায়। ফলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই (কিছু বিশেষ ব্যতিক্রম বাদে) মূলত পাঁচালি গোত্রের কবিতাই আমাদের ভিতর বেশি জনপ্রিয় হয়। বাঙালি মাত্রেই কাহিনীতে মজতে পছন্দ করে বেশি। ফলে যে কবিতা বিশেষ কোন গল্প বা ঘটনাকে তুলে ধরে না, সেই কবিতা তত বেশি জনপ্রিয়ও হয় না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জনপ্রিয় বিখ্যাত কবিতাগুলির তালিকা প্রস্তুত করলেই বিষয়টি হাতে নাতে প্রমাণিত হতে পারে। স্বয়ং রবি ঠাকুরেরও কাহিনী নির্ভর পাঁচালিধর্মী কবিতাগুলিই অধিকতর জনপ্রিয়। ঠিক যে কারণে কাহিনী নির্ভর না হওয়ায় কবির কাব্যজীবনের শেষ পর্বের কবিতাগুলি আজও বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছাতেই পারেনি।

অর্থাৎ আমরা একটু তলিয়ে দেখলে দেখতে পাবো, পাঁচালিধর্মী কাহিনীনির্ভর কবিতাগুলির সাথে পাঠক খুব সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। একটি নির্দিষ্ট প্লট বা ঘটনাকে অনুধাবন করতে পাঠককে বেগ পেতে হয় না। কবিতার প্রথম পাঠেই পাঠক কাহিনীর কাঠামোটিকে বা ঘটনার মূল নির্যাসটুকু ধরে ফেলতে পারে। কিংবা স্লোগানধর্মী কবিতা হলে, স্লোগানের সাথেও পাঠক সহজেই একাত্মতা অনুভব করতে পারে। এরপর কবিতা যদি আবৃত্তি যোগ্য হয়, তবে তো কথাই নাই। বাঙালি পাঠকের এই ট্র্যাডিশন কিন্তু বহু শতাব্দীর। সেই রামায়ণ মহাভারতের কথকতার যুগ থেকেই চলে আসছে। ইংরেজ শাসনের হাত ধরে আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়েও আমরা আমাদের আবহমান ঐতিহ্য বা সংস্কার থেকে বিচ্যুত হইনি আজও। তাই কবিতাতেও আমরা একটি সুস্পষ্ট গল্প খুঁজি। আর সেটি একবার পেয়ে গেলেই আমাদের কাব্যচর্চার পরিসমাপ্তি ঘটে। গল্পের সম্মোহনী ক্ষমতার জাদুতে একবার যদি কবি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তবে তো কথাই নাই। আমরা কবিতা ছেড়ে কবিকে জড়িয়ে ধরি। তাঁর খ্যাতির মহিমা নিয়েই টানাটানি করি। সেখানেই আমাদের যাবতীয় উন্মাদনা।

অবশ্যই সেই রামায়ণ মহাভারত, পাঁচালি কথকতার যুগ থেকে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। কিন্তু আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কারের ভরকেন্দ্র প্রায় একই জায়গায় রয়ে গিয়েছে। বাংলা কবিতা আধুনিক হয়ে উঠলেও বাংলা কবিতার পাঠক ততটা আধুনিক হয়ে উঠতে পারে নি। ফলত বাংলা কবিতা ও তার পাঠকের ভিতর আজ আর সামঞ্জস্য বিধান হয় না ঠিকমত। অনেকেই বলবেন কবির জনপ্রিয়তা তাহলে সম্ভব হয় কি করে? কবিতা ও তার পাঠকের ভিতর যদি সামঞ্জস্য বিধান নাই হয়? এই বিষয়ে পূর্বেই অনেকটা আলোকপাত করা হয়েছে। যেভাবেই হোক না কেন, কোন কবি একবার জনপ্রিয় হয়ে গেলেই তাঁর কোন ধরণের কবিতাগুলি জনপ্রিয়, তার হিসাব নিলেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে। আর ঠিক এই কারণেই, বাঙালি পাঠকের চেতনায়, কাব্যচর্চার পরিসর এতটাই অপ্রশস্ত। বাঙালি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় কবির খ্যাতির মূল্য তাঁর সামগ্রিক কাব্যচর্চার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। যে কারণে রবীন্দ্রসাহিত্যেও কবির নোবেল প্রাপ্তি তাই এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের চেতনায়। আমরা বুঝতে চাই না, কোন পুস্কারই কোন কবির সাহিত্যকীর্তির থেকে বড়ো নয়। আমরা বুঝতে পারি না যে, কবিখ্যাতির থেকেও অনেক বড়ো তাঁর সাহিত্যকীর্তি। আমরা তাই জানতেও পারি না, কবির কাব্য ছেড়ে কবির জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির পিছনে অধিকতর সময় ব্যায় করে আসলেই কি হারাই আমরা।

আমাদের সাহিত্যালোচনা ঠিক এই কারণেই সাহিত্যকে ত্যাগ করে ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। যেকোন ভাষার সাহিত্যধারায়, এইটি যদি প্রধানতম প্রবণতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই ভাষার সাহিত্য ক্রমাগত নিজ অক্ষের চারপাশেই ঘুরপাক খেতে থাকবে। তার পক্ষে উন্নততর স্তরে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে বাধ্য। দুঃখের বিষয় হলেও এই সময়ের বাংলাসাহিত্যের পরিসরে এই লক্ষ্মণই দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

৩০শে কার্তিক’ ১৪২৬

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s